শিরক
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলা শিরকের ভয়াবহ পরিণাম এবং তাঁর অসীম সার্বভৌমত্বের বর্ণনা দিয়েছেন:
اِنَّ اللّٰهَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِهٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰهِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا ﴿۴۸﴾
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তবে শিরক ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করল, সে এক ভয়াবহ মিথ্যা রটনা করল এবং মহাপাপে লিপ্ত হলো।
[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]
وَ مَنۡ اَضَلُّ مِمَّنۡ یَّدۡعُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ مَنۡ لَّا یَسۡتَجِیۡبُ لَهٗۤ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ وَ هُمۡ عَنۡ دُعَآئِهِمۡ غٰفِلُوۡنَ ﴿۵﴾
সেই ব্যক্তির চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? এমনকি তারা (যাদের ডাকা হচ্ছে) তাদের সেই আহ্বান বা প্রার্থনা সম্পর্কে কোনো খবরই রাখে না।
[সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ৫]
اَللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُهٗ سِنَۃٌ وَّ لَا نَوۡمٌ ؕ لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَهٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِهٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مَا خَلۡفَهُمۡ ۚ وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِهٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ کُرۡسِیُّهُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ ۚ وَ لَا یَـُٔوۡدُهٗ حِفۡظُهُمَا ۚ وَ هُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ ﴿۲۵۵﴾
আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব এবং মহাবিশ্বের সবকিছুর ধারক। ক্লান্তি বা ঘুম তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিকানা একমাত্র তাঁরই। তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করার সাধ্য কারো নেই। সৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু আছে—তার সবই তিনি জানেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া তাঁর অসীম জ্ঞানের কোনো কিছুই কেউ আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর সিংহাসন (কুরসি) সমস্ত আসমান ও জমিন জুড়ে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে; আর এই বিশাল সৃষ্টিজগতকে রক্ষা করা তাঁর জন্য মোটেও কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সুমহান।
[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫]
شَهِدَ اللّٰهُ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۙ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃُ وَ اُولُوا الۡعِلۡمِ قَآئِمًۢا بِالۡقِسۡطِ ؕ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿ؕ۱۸﴾
আল্লাহ নিজে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও এই সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কোনো উপাস্য নেই।
[সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৮]
ঈমানদার যুবক ও আছহাবুল উখদূদের কাহিনী
বহু বছর আগের এক রাজার গল্প। প্রতাপশালী সেই রাজার ছিল এক জাদুকর। জাদুকর যখন বুড়ো হয়ে গেল, সে রাজাকে বলল, “মহারাজ, আমার আয়ু তো ফুরিয়ে আসছে। আমাকে একটি বুদ্ধিমান ছেলে দিন, যাকে আমি আমার সব জাদুবিদ্যা শিখিয়ে দিয়ে যেতে পারি।” রাজা এক বালককে জাদুকরের কাছে পাঠালেন।
বালকটি প্রতিদিন জাদুকরের কাছে যাতায়াত করত। সেই পথের ধারে ছিল এক দরবেশের আস্তানা। একদিন বালকটি কৌতূহলবশত দরবেশের কাছে বসল এবং তার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল। এখন থেকে সে প্রতিদিন জাদুকরের কাছে যাওয়ার আগে দরবেশের কাছে বসে দ্বীনের কথা শুনত। এতে জাদুকরের কাছে পৌঁছাতে তার দেরি হতো এবং জাদুকর তাকে মারধর করত। বালকটি দরবেশকে সব খুলে বললে তিনি একটি বুদ্ধি শিখিয়ে দিলেন, “জাদুকর দেরি হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলবে বাড়ির লোকেরা দেরি করিয়েছে, আর বাড়ির লোক জিজ্ঞেস করলে বলবে জাদুকর দেরি করিয়েছে।”
এভাবেই চলছিল। একদিন বালকটি দেখল, পথের মাঝখানে এক বিশাল ভয়ংকর প্রাণী বসে আছে, যার ভয়ে লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বালকটি ভাবল, “আজই পরীক্ষা করার সুযোগ—কে বেশি সত্য? জাদুকর নাকি দরবেশ?” সে একটি পাথর হাতে নিয়ে বলল, “হে আল্লাহ! জাদুকরের চেয়ে যদি দরবেশের পথ তোমার কাছে বেশি প্রিয় হয়, তবে এই পাথরের আঘাতেই প্রাণীটিকে মেরে ফেলো।” বালকটি পাথর ছুড়তেই প্রাণীটি মারা গেল এবং মানুষের পথ পরিষ্কার হলো।
বালকটি যখন দরবেশকে এই খবর জানাল, দরবেশ বললেন, “বৎস! আজ তুমি আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ হয়ে গেছ। শীঘ্রই তোমার পরীক্ষা শুরু হবে। মনে রেখো, বিপদে পড়লেও আমার কথা প্রকাশ করো না।”
আল্লাহর দয়ায় সেই বালকের হাতে অলৌকিক ক্ষমতা এল। তার দোয়ায় অন্ধরা দৃষ্টি ফিরে পেত, কুষ্ঠরোগীরা ভালো হতো। রাজার এক অন্ধ সহচর এ কথা শুনে অনেক উপহার নিয়ে বালকের কাছে এসে বলল, “তুমি আমাকে সারিয়ে দাও, আমি সব তোমাকে দিয়ে দেব।” বালকটি বলল, “আমি তো আরোগ্য দিই না, সুস্থ করেন আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন, তবে আমি তাঁর কাছে আপনার জন্য দোয়া করব।” লোকটি ঈমান আনল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তার চোখ ভালো হয়ে গেল।
রাজা যখন দেখল তার সহচর দেখতে পাচ্ছে, সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে তোমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল?”
সহচর বলল, “আমার প্রতিপালক আল্লাহ।”
রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, “আমি ছাড়া তোমার আবার প্রভু কে?”
সহচর অটল থেকে বলল, “আমার এবং আপনার—উভয়ের প্রভু আল্লাহ।”
রাজা তখন লোকটিকে নির্যাতন শুরু করলে সে বালকের কথা বলে দিল। বালককে আনা হলে সে দরবেশের কথা প্রকাশ করে দিল। রাজা প্রথমে দরবেশকে এবং পরে সেই সহচরকে করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করল, কারণ তারা ঈমান ছাড়তে রাজি হননি।
এরপর রাজার নজর পড়ল বালকের ওপর। রাজা তার সৈন্যদের হুকুম দিল, “একে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাও। যদি ধর্ম না ছাড়ে, তবে নিচে ফেলে দাও।” পাহাড়ের ওপরে নিয়ে যাওয়ার পর বালকটি দোয়া করল, “হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে ইচ্ছা আমাকে রক্ষা করো।” সাথে সাথে পাহাড় কেঁপে উঠল এবং সৈন্যরা পড়ে মারা গেল, কিন্তু বালকটি সুস্থ শরীরে ফিরে এল। রাজা আবার তাকে বড় নৌকায় করে মাঝসমুদ্রে পাঠিয়ে দিলেন ডুবিয়ে মারার জন্য। সেখানেও বালকটি দোয়া করলে নৌকা ডুবে গেল এবং সৈন্যরা মারা গেল, কিন্তু বালকটি আবার অলৌকিকভাবে ফিরে এল।
বালকটি রাজাকে বলল, “আপনি আমাকে কখনো মারতে পারবেন না, যদি না আমি যা বলি তা করেন।”
রাজা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, “সেটা কী?”
বালকটি বলল, “সব মানুষকে একটি বিশাল ময়দানে জড়ো করুন। আমাকে একটি গাছের গুঁড়িতে বাঁধুন। তারপর আমার তূণীর থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকে গেঁথে বলুন—’বালকের প্রতিপালক আল্লাহর নামে’। তবেই আপনি সফল হবেন।”
রাজা তাই করলেন। হাজার হাজার মানুষের সামনে রাজা বললেন, “বালকের প্রতিপালক আল্লাহর নামে।” তীরটি বালকের কানের কাছে বিদ্ধ হলো এবং সে মারা গেল। এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে উপস্থিত সব মানুষ চিৎকার করে বলে উঠল, “আমরা এই বালকের প্রতিপালকের ওপর ঈমান আনলাম!”
রাজা ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি এবার এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিলেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশাল গর্ত খুঁড়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। ঘোষণা করা হলো, যারা ঈমান ত্যাগ করবে না, তাদের এই আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে। মানুষ হাসিমুখে আগুনের গর্তে ঝাঁপ দিতে লাগল। অবশেষে এক নারী তার দুধের শিশুকে নিয়ে গর্তের পাড়ে এসে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি কিছুটা ইতস্তত করছিলেন। তখন আল্লাহর কুদরতে সেই শিশুটি কথা বলে উঠল, “মা, আপনি সবর করুন। ভয় পাবেন না, কারণ আপনি সত্যের ওপর আছেন।”
পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এই “গর্তওয়ালাদের” (আছহাবুল উখদুদ) কঠিন পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কাহিনী থেকে শিক্ষা:
- অবিচল বিশ্বাস: সত্যের পথে মুমিন কখনো বাতিলের কাছে মাথা নত করে না।
- দোয়ার শক্তি: বিপদগ্রস্ত অবস্থায় একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হয়।
- পরীক্ষা ও ধৈর্য: ঈমানের পথে বাধা বা পরীক্ষা আসবেই, ধৈর্য ধরলে বিজয় সুনিশ্চিত।
- চূড়ান্ত বিজয়: বাহ্যিকভাবে মুমিনরা মারা গেলেও, ঈমানের মাধ্যমে তাদের নৈতিক বিজয় এবং পরকালের জান্নাত নিশ্চিত হয়।
কাপড় পরিধানের সুন্নাতসমূহ
ইসলামে পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রেও চমৎকার কিছু সুন্নাত রয়েছে, যা আমাদের প্রাত্যহিক কাজকে ইবাদতে পরিণত করে:
১. বিসমিল্লাহ পড়া: কাপড় পরা এবং খোলার—উভয় সময়ই ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করা।
২. পোশাক পরিধানের দোয়া পড়া: নতুন বা যেকোনো পোশাক পরার সময় এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাত:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي هَذَا وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ
অর্থাৎ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে এই কাপড় পরিধান করিয়েছেন এবং আমার কোনো শক্তি ও সামর্থ্য ছাড়াই এটি আমাকে দান করেছেন।”
৩. ডান দিক থেকে শুরু করা: জামা বা পায়জামা পরার সময় প্রথমে ডান হাত বা ডান পা দিয়ে শুরু করা।
৪. বাম দিক থেকে খোলা: কাপড় খোলার সময় বাম দিক থেকে শুরু করা (অর্থাৎ প্রথমে বাম হাত বা বাম পা বের করা)।
যাকাত আদায় না করার পরিণাম
যাকাত আদায় না করা বা আল্লাহর দেওয়া সম্পদে কৃপণতা করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَا يَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ بِمَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ هُوَ خَيۡرٗا لَّهُمۖ بَلۡ هُوَ شَرّٞ لَّهُمۡۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِۦ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ وَلِلَّهِ مِيرَٰثُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٞ ١٨٠﴾ [ال عمران: ١٨٠]
“আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যাদের ধন-সম্পদ দান করেছেন, তারা যেন সেই সম্পদে কৃপণতা করে একে নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে; বরং এটি তাদের জন্য একান্তই ক্ষতিকর। তারা যা নিয়ে কৃপণতা করছে, কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে। আর আসমান ও জমিনের যাবতীয় উত্তরাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা কিছু করছ, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।”
[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮০]
রমাদান এলে সালাফদের জীবন যেন নতুন ছন্দে জেগে উঠত—সময় তখন আর ঘড়িতে নয়, গোনা হতো আয়াতে আয়াতে।
ইবরাহীম নাখাঈ (রহ.) বর্ণনা করেন—
আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ (রহ.) রমাদান মাসে প্রতি দুই রাতে একবার পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। মাগরিব ও ইশার মাঝখানে অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে আবার তিলাওয়াতে নিমগ্ন হতেন। আর রমাদান ছাড়া অন্য সময়ে প্রতি ছয় রাতে একবার খতম সম্পন্ন করতেন।
— ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৪/৫১
এ ছিল তাঁদের রমাদান—ইবাদতে নিবিষ্ট, কুরআনে মগ্ন, সময়কে আখিরাতের পাথেয় বানানোর এক অনন্য সাধনা।