নামাজ
নামাজ আল্লাহর সান্নিধ্য ও সাহায্যের মাধ্যম | পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নামাজের গুরুত্ব এবং এর মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার উপায় সম্পর্কে এভাবে বর্ণনা করেছেন:
وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ وَ ارۡکَعُوۡا مَعَ الرّٰکِعِیۡنَ ﴿۴۳﴾
তোমরা সঠিক নিয়ম মেনে নামাজ কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং যারা আল্লাহর সামনে অবনত হয় (রুকু করে), তাদের সাথে তোমরাও অবনত হও। [সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৩]
وَ اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ وَ اِنَّهَا لَکَبِیۡرَۃٌ اِلَّا عَلَی الۡخٰشِعِیۡنَ ﴿ۙ۴۵﴾
তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিঃসন্দেহে এটি একটি কঠিন কাজ, তবে যারা বিনীত বা আল্লাহভীরু, তাদের জন্য এটি মোটেও কঠিন নয়। [সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫]
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ ﴿۱۵۳﴾
হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের উসিলায় আল্লাহর সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই আছেন। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩]
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَقۡرَبُوا الصَّلٰوۃَ وَ اَنۡتُمۡ سُکٰرٰی حَتّٰی تَعۡلَمُوۡا مَا تَقُوۡلُوۡنَ وَ لَا جُنُبًا اِلَّا عَابِرِیۡ سَبِیۡلٍ حَتّٰی تَغۡتَسِلُوۡا ؕ وَ اِنۡ کُنۡتُمۡ مَّرۡضٰۤی اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ اَوۡ جَآءَ اَحَدٌ مِّنۡکُمۡ مِّنَ الۡغَآئِطِ اَوۡ لٰمَسۡتُمُ النِّسَآءَ فَلَمۡ تَجِدُوۡا مَآءً فَتَیَمَّمُوۡا صَعِیۡدًا طَیِّبًا فَامۡسَحُوۡا بِوُجُوۡهِکُمۡ وَ اَیۡدِیۡکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ عَفُوًّا غَفُوۡرًا ﴿۴۳﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলছো তা বুঝতে পারো (অর্থাৎ সচেতন হও)। আর ফরয গোসল অবস্থায়ও নামাজের কাছে যেও না, যতক্ষণ না তোমরা গোসল করো (তবে মুসাফির অবস্থায় পানি না পেলে ভিন্ন কথা)। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও, সফরে থাকো, শৌচাগার থেকে ফিরে আসো কিংবা স্ত্রী সহবাস করো এবং পরে পানি না পাও—তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো। তায়াম্মুমের সময় তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। [সুরা নিসা, আয়াত: ৪৩]
কা‘ব বিন মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর তওবা
মদীনার তপ্ত মরুভূমিতে যখন রোমান বাহিনীর মোকাবেলায় ‘তাবূক যুদ্ধের’ দামামা বেজে উঠল, তখন সময়টা ছিল ভীষণ গরমের। গাছে গাছে ফল পেকেছে, মানুষ গাছের শীতল ছায়ায় বিশ্রাম নিতে চাইছে। নবীজি ﷺ সাহাবীদের নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। কা‘ব বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন সচ্ছল ও শক্তিশালী যুবক। তাঁর কাছে তখন দুটি সওয়ারী উট ছিল, যা আগে কখনো ছিল না। কিন্তু এক অদ্ভুত দোদুল্যমনতা তাঁকে পেয়ে বসল। প্রতিদিন তিনি ভাবতেন কাল প্রস্তুতি নেবেন, কিন্তু দিন যায়, প্রস্তুতি আর নেওয়া হয় না।
অবশেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিশাল বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। কা‘ব ভাবলেন, “আমি তো শক্তিশালী, দ্রুত গিয়ে তাঁদের ধরে ফেলব।” কিন্তু আলস্য ও দ্বিধা তাঁকে মদীনাতেই আটকে রাখল। মদীনার পথে পথে যখন তিনি বের হতেন, দেখতেন কেবল মুনাফিক অথবা অক্ষম বৃদ্ধরা রয়ে গেছে। এই দৃশ্য তাঁকে ভীষণ ব্যথিত করত।
যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মদীনায় ফিরলেন, তখন প্রায় ৮০ জন মুনাফিক তাঁর কাছে এসে মিথ্যা ওজর দেখিয়ে শপথ করতে লাগল। নবীজি ﷺ তাদের বাহ্যিক কথা মেনে নিয়ে ক্ষমা করে দিলেন। কিন্তু কা‘ব বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সিদ্ধান্ত নিলেন—বিপদ যা-ই আসুক, তিনি সত্য বলবেন।
রাসূল ﷺ-এর সামনে গিয়ে কা‘ব বিনীতভাবে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি কোনো দুনিয়াদার মানুষের সামনে বসতাম, তবে মিথ্যা বলে পার পেয়ে যেতাম। কিন্তু আমি জানি, আজ যদি আপনাকে মিথ্যা বলে খুশি করি, আল্লাহ অচিরেই আমার ওপর আপনাকে রাগান্বিত করবেন। আল্লাহর কসম! আমার কোনো ওজর ছিল না। আমি তখন পুরোপুরি সুস্থ ও সচ্ছল ছিলাম।”
নবীজি ﷺ বললেন, “এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। এখন যাও, আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কী ফয়সালা দেন অপেক্ষা করো।”
আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা না আসা পর্যন্ত নবীজি ﷺ মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন কেউ যেন কা‘ব এবং আরও দুজন সত্যবাদী সাহাবীর (মুরারাহ ও হিলাল) সাথে কথা না বলে। শুরু হলো এক কঠিন পরীক্ষা। দীর্ঘ ৫০ দিন কা‘ব বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে কেউ কথা বলেনি। নিজের চিরচেনা শহর ও আপনজনদের কাছে তিনি পরবাসী হয়ে গেলেন। এমনকি সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ও চাচাতো ভাই আবূ ক্বাতাদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-ও তাঁর সালামের উত্তর দেননি।
এই চরম সংকটের সময় সিরিয়ার গাসসান রাজা তাঁকে চিঠি পাঠিয়ে নিজের দরবারে আশ্রয় নেওয়ার প্রলোভন দেখাল। কা‘ব সেই চিঠিটি চুলার আগুনে পুড়িয়ে দিলেন, কারণ এটি ছিল তাঁর ঈমানের আরেক পরীক্ষা। ৪০ দিন পর নবীজির নির্দেশ এল—স্ত্রীদের থেকেও পৃথক থাকতে হবে। কা‘ব তা-ই করলেন। পৃথিবীটা তাঁর জন্য দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছিল।
অবশেষে ৫০তম দিনটি এল। ফজরের নামাজের পর মদীনার আকাশে-বাতাসে এক খুশির আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো— “হে কা‘ব বিন মালিক! সুসংবাদ নাও!” পাহাড়ের ওপর থেকে এক ব্যক্তি চিৎকার করে এই খবর দিচ্ছিল। কা‘ব সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল করে তাঁদের তিনজনের তওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
কা‘ব যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন, তখন খুশিতে রাসূল ﷺ-এর চেহারা চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তিনি বললেন, “তোমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিনের সুসংবাদ নাও।” কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কৃতজ্ঞতায় নিজের সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় সাদকা করে দিতে চাইলেন এবং শপথ করলেন যে, যতদিন বেঁচে থাকবেন কখনো আর মিথ্যা বলবেন না।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪৪১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৭৬৯]
এই ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা:
- সত্যবাদিতার শক্তি: সাময়িকভাবে সত্য বলা কঠিন মনে হলেও দিনশেষে সত্যই মানুষকে চূড়ান্ত মুক্তি দেয়।
- বিপদের আশ্রয় আল্লাহ: যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন কেবল আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করা উচিত।
- প্রলোভন উপেক্ষা: প্রকৃত মুমিন দুনিয়ার কোনো রাজকীয় প্রলোভনের বিনিময়ে নিজের ঈমান বিকিয়ে দেয় না।
- তওবার মহিমা: আন্তরিকভাবে তওবা করলে আল্লাহ পাহাড়সম অপরাধও ক্ষমা করে দেন এবং সেই বান্দাকে নিজের প্রিয় করে নেন।
ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুন্নাতসমূহ
ঘর আমাদের প্রশান্তির নীড়। এই প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় নিচের সুন্নাতগুলো অনুসরণ করলে ঘর বরকতময় হয়ে ওঠে:
১. ঘরে প্রবেশের সুন্নাত:
আল্লাহর স্মরণ: ঘরে ঢোকার সময় মহান আল্লাহকে স্মরণ করা।
প্রবেশের দোয়া পাঠ করা: ঘরে প্রবেশের সময় এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلَجِ وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ، بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا
অর্থাৎ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উত্তম প্রবেশ এবং উত্তম প্রস্থান প্রার্থনা করছি। আল্লাহর নামেই আমরা প্রবেশ করি এবং আল্লাহর নামেই আমরা বের হই; আর আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ওপরই আমরা ভরসা করি।”
সালাম দেওয়া: ঘরে ঢুকে পরিবারের সকলকে সালাম দেওয়া।
মিসওয়াক করা: ঘরে প্রবেশের পর মিসওয়াক করা সুন্নাত।
২. ঘর থেকে বের হওয়ার সুন্নাত:
বের হওয়ার দোয়া পাঠ করা: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিচের দোয়াটি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ:
بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
অর্থাৎ: “আল্লাহর নামে বের হচ্ছি, আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ক্ষমতা ও শক্তি নেই।”
এই দোয়ার ফজিলত:
যে ব্যক্তি বের হওয়ার সময় এই দোয়াটি পড়ে, তাকে বলা হয়— “তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তুমি সব বিপদ থেকে রক্ষা পেলে।” আর শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়।
সঙ্গত কারণ ছাড়া রমযানের সাওম ভঙ্গ করা বা না রাখা
ইসলামের মৌলিক কাঠামোর মধ্যে রমজানের রোজা বা সাওম অন্যতম। উপযুক্ত কারণ ছাড়া এই রোজা ভঙ্গ করা বা না রাখা অত্যন্ত বড় গুনাহ। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«بني الإسلام على خمس شهادة أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله وإقام الصلوة وإيناء الزكاة وحج البيت وصوم رمضان».
“ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। সেগুলো হলো—
১. এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।
২. সালাত (নামাজ) কায়েম করা।
৩. যাকাত আদায় করা।
৪. বায়তুল্লাহর হজ করা।
৫. রমজান মাসের সাওম (রোজা) রাখা।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭]
রমাদান এলে সালাফদের দিন-রাতের ব্যস্ততা বদলে যেত—কথা কম, তিলাওয়াত বেশি; বিশ্রাম কম, কুরআনের সান্নিধ্য বেশি।
হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহ.) প্রতি দুই রাতে একবার পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। আয়াতের পর আয়াত তিনি তিলাওয়াত করতেন গভীর মনোযোগে, যেন প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে নেমে আসে, প্রতিটি আয়াত জীবনে রূপ নেয়।
— ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৪/৩২৫
এভাবেই কুরআন ছিল তাঁদের সঙ্গী, নূর ও নাজাতের পথপ্রদর্শক—এক অনবরত আত্মশুদ্ধির যাত্রা।