সত্যবাদিতা
সত্য মানবজীবনের মৌলিক নৈতিক ভিত্তি। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সবকিছুর স্থিতি নির্ভর করে সত্যের উপর। ইসলাম সত্যকে কেবল একটি নৈতিক গুণ হিসেবে নয়; বরং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কুরআন বারবার সত্যবাদিতার নির্দেশ দিয়েছে এবং সত্যবাদীদের উচ্চ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছে।
সত্যবাদীদের সাথে থাকার নির্দেশ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।”
(সূরা আত-তাওবা: ৯:১১৯)
এই আয়াতে সত্যকে তাকওয়ার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সত্যবাদিতা আল্লাহভীতিরই বাস্তব প্রকাশ। শুধু সত্য বলা নয়—সত্যবাদীদের সঙ্গ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সত্য একটি সামাজিক শক্তি; এটি পরিবেশ গড়ে তোলে।
সত্যবাদীদের মর্যাদা:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ
“আর যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা থাকবে তাদের সাথে—যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ।”
(সূরা আন-নিসা: ৪:৬৯)
এখানে “الصِّدِّيقِينَ” (সিদ্দীকগণ) নবীদের পরেই উল্লেখিত হয়েছে। এটি সত্যবাদিতার সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রমাণ।
সত্য—নাজাতের শর্ত
আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিনের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন—
هَٰذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ
“এ সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীদের তাদের সত্য তাদের উপকার করবে।”
(সূরা আল-মায়িদা: ৫:১১৯)
অর্থাৎ আখিরাতে সত্যই হবে মুক্তির কারণ।
কা’ব বিন আশরাফের মৃত্যুকাহিনী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দেখলেন কা’ব বিন আশরাফ তার সীমালঙ্ঘন ও বিদ্বেষের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিচ্ছে, তখন তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করার জন্য কে প্রস্তুত আছ?” তৎক্ষণাৎ মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে আমি তাকে হত্যা করি?” নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ।”
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি কৌশলী পরিকল্পনা করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট কৌশল হিসেবে কিছু কথা বলার অনুমতি নিলেন। এরপর তিনি কা’ব বিন আশরাফের কাছে গিয়ে বললেন, “এই লোকটি (নবীজি) তো আমাদের কাছে সদকা চায় এবং সে আমাদের অনেক কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার কাছে কিছু ঋণ নিতে এসেছি।”
কা’ব অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে বলল, “আল্লাহর কসম! সে তোমাদের ভবিষ্যতে আরও অতিষ্ঠ করে তুলবে।” মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ কৌশলে উত্তর দিলেন, “আমরা তো এখন তাঁর অনুসারী হয়ে গেছি, তাই শেষ না দেখে তাঁকে ছাড়তে পারছি না। আপনি আমাদের কিছু খাদ্য ধার দিন।” কা’ব শর্ত দিল যে, ঋণের বিনিময়ে কিছু বন্ধক রাখতে হবে। সে প্রথমে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ-র স্ত্রীদের এবং পরে সন্তানদের বন্ধক রাখার দাবি করল। কিন্তু মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “আপনি আরবের একজন সুদর্শন ব্যক্তি, আপনার কাছে স্ত্রীদের রাখা নিরাপদ নয়। আর সন্তানদের বন্ধক রাখা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। তবে আমরা আপনার কাছে অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি।” কা’ব এতে রাজি হলো। মূলত এটি ছিল একটি পরিকল্পনা, যেন পরবর্তীতে অস্ত্র নিয়ে কা’বের দুর্গে প্রবেশ করলে সে সন্দেহ না করে।
সফর শেষে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ ফিরে এলেন এবং রাতের অন্ধকারে কা’বের দুধ ভাই আবূ নায়েলা এবং আরও কয়েকজন সাহাবীকে (আবূ আবস্ ইবনু জাবর, হারিছ ইবনু আওস এবং আব্বাদ ইবনু বিশর) সাথে নিয়ে কা’বের দুর্গে গেলেন। রাতের গভীরে কা’ব তাদের কন্ঠ শুনে নিচে নেমে আসার প্রস্তুতি নিল। তার স্ত্রী এই অসময়ে তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করল। স্ত্রী বলল, “আমি এমন একটি ডাক শুনতে পাচ্ছি যা থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে মনে হচ্ছে।” কিন্তু কা’ব তা গ্রাহ্য না করে বলল, “এরা তো আমারই লোক, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবূ নায়েলা এসেছে। ভদ্র মানুষকে রাতে ডাকলে তার যাওয়া উচিত।”
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ তাঁর সাথীদের আগেই বলে রেখেছিলেন, “সে আসলে আমি তার চুলের সুঘ্রাণ শোঁকার বাহানা করব। আমি যখন তাকে শক্ত করে চেপে ধরব, তখন তোমরা তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করবে।”
কা’ব চাদর জড়িয়ে নিচে নামলে তার শরীর থেকে তীব্র সুঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছিল। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ বললেন, “আজকের মতো এত চমৎকার সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি!” কা’ব গর্ব করে বলল, “আমার কাছে আরবের সবচেয়ে সুন্দরী ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধি ব্যবহারকারী নারী আছে।” মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ অনুরোধ করলেন, “আমাকে কি আপনার মাথা শোঁকার অনুমতি দেবেন?” কা’ব রাজি হলো। তিনি নিজে শুঁকলেন এবং তাঁর সাথীদেরও শুঁকালেন।
এরপর তিনি দ্বিতীয়বার অনুমতি নিয়ে পুনরায় কা’বের মাথা শুঁকলেন এবং তাকে কাবু করে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। অমনি তিনি সাথীদের চিৎকার করে বললেন, “তোমরা তাকে হত্যা করো!” উপস্থিত সাহাবীগণ তৎক্ষণাৎ তরবারি দিয়ে কা’ব বিন আশরাফকে আঘাত করে হত্যা করলেন। অভিযান শেষে তাঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট ফিরে এসে এই সফলতার খবর দিলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪০৩৭।
ঘুমানোর পূর্বের সুন্নাত ও আদবসমূহ
দৈনিক ঘুমের এই সময়টুকুকে ইবাদতে পরিণত করতে এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে নিচের সুন্নাহগুলো পালন করা অত্যন্ত জরুরি:
১. ঘুমানোর পূর্বের পঠিতব্য দোয়া
বিছানায় যাওয়ার পর এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাত:
اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ أَمُوتُ وَأَحْيَا
(উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া)
অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার নাম নিয়েই আমি মৃত্যুবরণ করছি (ঘুমাচ্ছি) এবং তোমার নাম নিয়েই জীবিত হবো (জেগে উঠবো)।
২. ঘুমের আদব ও প্রস্তুতি
পবিত্রতা: ওজু করে পবিত্র অবস্থায় বিছানায় যাওয়া।
বিছানা ঝাড়া: ঘুমানোর আগে বিছানাটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ভালোভাবে ঝেড়ে নেওয়া।
শয়নের পদ্ধতি: ডান কাতে শয়ন করা এবং ডান হাত ডান গালের নীচে রাখা।
৩. অনিষ্ট থেকে বাঁচার আমল (সূরাসমূহ)
তিন কুল পাঠ ও মাসেহ: দুই হাত একত্রিত করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস পাঠ করে ফু দেওয়া এবং মাথা ও মুখমন্ডল থেকে শুরু করে শরীরের যতটুকু অংশ সম্ভব তিনবার মাসেহ করা।
সূরা কাফিরুন: ঘুমানোর আগে সূরা কাফিরুন পাঠ করা, যা মানুষকে শিরক থেকে মুক্ত রাখে।
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬) পাঠ করা। যে ব্যক্তি রাতে এই দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার সকল বিপদের জন্য যথেষ্ট হবে।
৪. আয়াতুল কুরসী পাঠের ফযীলত
বিছানায় শোয়ার পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করা। এর ফলে:
আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন বিশেষ রক্ষক (ফেরেশতা) তাকে পাহারা দেন।
সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারে না।
অহংকার ও আত্মম্ভরিতা
ইসলামী শরীয়তে অহংকারকে কুফরীর প্রবেশদ্বার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ﷺ এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন:
আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
ؕ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡتَکۡبِرِیۡنَ ﴿۲۳﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ২৩]
অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। ইবলিস কেবল অহংকারের কারণেই আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছিল এবং চিরস্থায়ী অভিশপ্ত হয়েছিল। সুতরাং সত্যের বিরুদ্ধে অহংকার করলে ঈমান কোনো উপকারে আসে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ অহংকারের ভয়াবহতা এবং এর প্রকৃত সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন:
«لايدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبر، قال رجل إن الرجل يحب أن يكون ثوبه حسنا ونعله حسنة؟ قال صلى الله هليه وسلم: فإن الله جميل يحب الجمال، الكبر بطر الحق وغمط الناس».
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ (এক বিন্দু) অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
তখন এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, “মানুষ তো চায় তার পোশাক ও জুতো সুন্দর হোক, এটাও কি অহংকার?” রাসূলুল্লাহ ﷺ উত্তর দিলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। (অর্থাৎ সুন্দর পোশাক অহংকার নয়)। প্রকৃত অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা (হটকারিতা) এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৩১]
পবিত্র কুরআনে এসেছে লোকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে নসিহত করতে গিয়ে বলেন:
وَ لَا تُصَعِّرۡ خَدَّکَ لِلنَّاسِ وَ لَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ کُلَّ مُخۡتَالٍ فَخُوۡرٍ ﴿ۚ۱۸﴾
“অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
[সূরা লোকমান, আয়াত: ১৮]
অহংকার করা কেবল আল্লাহর গুণ। কোনো সৃষ্টির জন্য তা শোভা পায় না। হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يقول الله تبارك وتعالى: العظمة إزاري والكبرياء ردائي فمن نازعني فيهما القيته في النار».
“মহত্ব আমার পরিধেয় বস্ত্র এবং অহংকার আমার চাদর। যে ব্যক্তি এই দুটির কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে টানাটানি (অহংকার) করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৬৪৬০]
রমাদান এলে তাঁদের হৃদয় যেন আরও বেশি কুরআনের দিকে ঝুঁকে পড়ত—আয়াতের সুরেই খুঁজে নিতেন প্রশান্তি, তিলাওয়াতেই খুঁজে নিতেন শক্তি।
ইমাম শাফিঈ (রহ.) রমাদান মাসে প্রতিদিন দুই খতম করে পুরো মাসে ষাট খতম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর রমাদান ছাড়া অন্যান্য মাসেও তিনি থেমে থাকতেন না—ত্রিশ খতম সম্পন্ন করতেন নিয়মিতভাবে।
— তারিখে বাগদাদ, ২/৬১