জান্নাত
মহান আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে মুমিন ও নেককার বান্দাদের জন্য জান্নাতের অতি মনোরম ও শান্তিময় জীবনের বর্ণনা দিয়েছেন। এই মহিমান্বিত পুরস্কার সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেন:
وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُهُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡهَاۤ اَبَدًا ؕ لَهُمۡ فِیۡهَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَهَّرَۃٌ ۫ وَّ نُدۡخِلُهُمۡ ظِلًّا ظَلِیۡلًا ﴿۵۷﴾
“আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, অবশ্য আমি প্রবিষ্ট করাব তাদেরকে জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহর সমূহ। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্ত্রীগণ। তাদেরকে আমি প্রবিষ্ট করব ঘন ছায়ানীড়ে।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৭)
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, জান্নাত কেবল বসবাসের স্থান নয়, বরং এটি এমন এক উদ্যান যেখানে স্নিগ্ধ নহর বয়ে যায় এবং যেখানে মুমিনরা ঘন ও শীতল ছায়ার আশ্রয়ে পরম শান্তিতে থাকবে।
জান্নাতবাসীদের প্রশান্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
لَا یَمَسُّهُمۡ فِیۡهَا نَصَبٌ وَّ مَا هُمۡ مِّنۡهَا بِمُخۡرَجِیۡنَ ﴿۴۸﴾
“সেখানে তাদের মোটেই কষ্ট হবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃত হবে না।” (সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৪৮)
অর্থাৎ, দুনিয়ার জীবনের মতো জান্নাতে কোনো রোগ-শোক, ক্লান্তি বা অবসাদ থাকবে না। একবার সেখানে প্রবেশ করলে কাউকে আর সেখান থেকে বের করে দেওয়া হবে না; বরং এটিই হবে তাদের চিরদিনের আবাস।
পরম সুখের এই জান্নাত লাভের পাথেয় হলো বিশুদ্ধ ঈমান এবং একনিষ্ঠভাবে নেক কাজ করা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই জান্নাতের অধিকারী হওয়ার তৌফিক দান করুন।
ইতিহাসের পাতায় আমানতদারিতার এমন কিছু বিরল ঘটনা রয়েছে যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দেয় প্রকৃত মুমিনের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত। এমনই একটি সত্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে হাদীস শরীফে।
জমি ও স্বর্ণের কলস
এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির কাছ থেকে একখণ্ড জমি ক্রয় করলেন। জমি কেনার পর ক্রেতা যখন সেই জমি খনন করতে গেলেন, তখন সেখানে হঠাৎ একটি স্বর্ণভর্তি কলস খুঁজে পেলেন। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এমন সম্পদ পাওয়া আনন্দের বিষয় হলেও, সেই আল্লাহভীরু ক্রেতার নিকট এটি ছিল এক বিশাল আমানত।
তিনি তৎক্ষণাৎ বিক্রেতার কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, “ভাই, তোমার এই স্বর্ণের কলসটি বুঝে নাও। আমি তোমার কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছি মাত্র, এই স্বর্ণ ক্রয় করিনি। তাই এই সম্পদের ওপর আমার কোনো অধিকার নেই।”
বিক্রেতার নির্লোভ উত্তর
জমি বিক্রেতাও ছিলেন সমান সৎ ও নির্লোভ। তিনি সম্পদটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বললেন, “আমি যখন জমিটি বিক্রি করেছি, তখন এর ভেতরে যা কিছু আছে তার সবকিছুসহই তোমার নিকট বিক্রি করে দিয়েছি। সুতরাং এই স্বর্ণের মালিক এখন তুমিই।”
ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয়েই যখন সম্পদের মালিকানা গ্রহণে অসম্মতি জানালেন, তখন তারা এই অমীমাংসিত বিষয়টি নিয়ে তৃতীয় এক ব্যক্তির কাছে বিচার চাইলেন।
বিচারকের প্রজ্ঞা ও চমৎকার সমাধান
বিচারক বা মীমাংসাকারী ব্যক্তিটি উভয় পক্ষের সততা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কি কোনো ছেলে-মেয়ে আছে?”
উত্তরে একজন বললেন, “আমার একটি ছেলে আছে।” অন্যজন বললেন, “আমার একটি মেয়ে আছে।” তখন প্রজ্ঞাবান বিচারক ফয়সালা দিলেন, “তোমরা তোমাদের এই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিবাহের ব্যবস্থা করো। এই স্বর্ণের কিছু অংশ তাদের বিবাহের কাজে ব্যয় করো এবং অবশিষ্ট অংশ তাদের জীবনযাপনের জন্য দিয়ে দাও।” এভাবেই এক চমৎকার সমাধানের মাধ্যমে দুই সৎ ব্যক্তির আমানতদারিতার মূল্যায়ন হলো।
[ বুখারি হাদিস: ৩৪৭২, ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৪, মুসলিম হাদিস: ১৭২১]
খাবার গ্রহণে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর প্রিয় সাহাবীগণকে (রাদ্বিআল্লাহু আনহুম) ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ—প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি কর্ম ও পদক্ষেপ মানবতার জন্য সফলতার পাথেয় এবং মুমিনের জীবনে প্রশান্তির উৎস। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও পদ্ধতিগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. খাবার গ্রহণের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা
রাসূলুল্লাহ ﷺ খাবার গ্রহণের আগে সব সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতেন এবং সঙ্গীদেরও তা বলতে উৎসাহিত করতেন। তিনি ﷺ বলেন:
‘আল্লাহর নাম নিয়ে ও ডান হাত দ্বারা খানা খাও এবং তোমার দিক হতে খাও।’ (বুখারি: ৫১৬৭, তিরমিজি: ১৯১৩)
২. হাত ধুয়ে শুরু ও শেষ করা
স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুন্নাহর অংশ হিসেবে খাওয়ার আগে হাত ধোয়া আবশ্যক। আয়েশা (রাদ্বিআল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ পানাহারের আগে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন। (মুসনাদে আহমাদ)
৩. দস্তরখান বিছিয়ে খাওয়া
বিনয় ও সুন্নাহর অনুসরণে রাসূলুল্লাহ ﷺ মাটির কাছাকাছি বসে দস্তরখানে খাবার খেতেন। আনাস (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) বলেন:
‘রাসূলুল্লাহ ﷺ পায়াবিশিষ্ট বড় পাত্রে খাবার খেতেন না।’ কাতাদা (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে কীসের ওপর খানা খেতেন? তিনি বললেন, ‘চামড়ার দস্তরখানের ওপর।’ (বুখারি: ৫৩৮৬)
৪. ডান হাত দিয়ে খাওয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ আজীবন ডান হাত দিয়ে খাবার খেতেন এবং বাম হাত দিয়ে খেতে নিষেধ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে।’ (বুখারি: ৫৩৭৬, মুসলিম: ২০২২)
৫. হাত ও আঙুল চেটে খাওয়া
খাবারের বরকত লাভের আশায় রাসূলুল্লাহ ﷺ খাওয়ার পর হাত ও আঙুল চেটে খেতেন। ইবনে আব্বাস (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাতকে মুছবে (ধোয়া) না।’ (বুখারি: ৫২৪৫)
আঙুল চেটে খাওয়ার গুরুত্ব দিয়ে তিনি ﷺ আরও বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না।’ (ইবনে মাজাহ: ১৯১৪)
৬. পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া
অপচয় রোধে রাসূলুল্লাহ ﷺ দস্তরখানে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে পরিষ্কার করে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জাবের (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লোকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না।’ (তিরমিজি: ১৯১৫, ইবনে মাজাহ: ৩৪০৩)
৭. হেলান দিয়ে না খাওয়া
অহংকার বর্জন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য হেলান দিয়ে খাওয়া অনুচিত। আবু হুজাইফা (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ জনৈক ব্যক্তিকে বলেছিলেন:
‘আমি টেক লাগানো বা হেলান দেওয়া অবস্থায় কোনো কিছু ভক্ষণ করি না।’ (বুখারি: ৫১৯০, তিরমিজি: ১৯৮৬)
৮. খাবারের দোষ-ত্রুটি না ধরা
খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা বা ঝগড়া করা মুমিনের স্বভাব নয়। আবু হুরায়রা (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) বলেন:
‘রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তাঁর পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না।’ (বুখারি: ৫১৯৮, ইবনে মাজাহ: ৩৩৮২)
৯. খাবারে ফুঁ না দেওয়া
স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে রাসূলুল্লাহ ﷺ খাবারে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো খাবারে বা পানীয়তে ফুঁ দিতেন না। (ইবনে মাজাহ: ৩৪১৩)
১০. খাবারের শেষে দোয়া পড়া
আহার শেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য। আবু উমামা (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ খাবার শেষ করে এই দোয়া পড়তেন:
‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা।’
কখনো তিনি এই দোয়া পড়তেন: ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’ (বুখারি: ৫৪৫৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই সুন্নাহগুলো আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারলে জীবন হবে সুন্দর, স্বাস্থ্যকর ও বরকতময়। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন।
জুয়া: শয়তানের অপবিত্র কাজ ও তার ভয়াবহতা
ইসলামী শরীয়তে জুয়াকে কেবল অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হয়নি, বরং এটিকে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ধ্বংসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর ভয়াবহতা নিচে তুলে ধরা হলো:
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের সতর্ক করে দিয়ে ইরশাদ করেন:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَ الۡمَیۡسِرُ وَ الۡاَنۡصَابُ وَ الۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡهُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ﴿۹۰﴾
“হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ, এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৯০]
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, জুয়া ও মাদক মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের পথে প্রধান অন্তরায়।
রমাদান এলে সালাফদের দিনগুলো পেত এক অনন্য ছন্দ—যেখানে কথার শব্দ কমে যেত, মন মিলত আয়াতের সাথে, আর প্রতিটি মুহূর্ত পরিণত হত তিলাওয়াতের অবিচ্ছিন্ন সাধনায়।
ইমাম মুজাহিদ (রহ.) রমাদান মাসে প্রতিদিন একবার পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। প্রতিটি দিন ছিল একটি পূর্ণ খতমের অঙ্গীকার—ধারাবাহিক, নিবেদিত এবং গভীর মনোযোগের সাথে। এভাবে ত্রিশ দিনের রমাদান পরিণত হতো ত্রিশটি পূর্ণ কুরআন সফরে, যেখানে প্রতিটি আয়াত হৃদয়ে রেখে তিনি এগিয়ে যেতেন আত্মশুদ্ধির পথে।
— ইমাম নববী, আত-তিবইয়ান ফি আদাবি হামালাতিল কুরআন, পৃ. ৭৪