আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অসীম ক্ষমা ও দয়ার কথা উল্লেখ করে মুমিনদের আশান্বিত করেছেন। নিচে আয়াতগুলোর মর্মবাণী অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরা হলো:
আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন যে,
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ الَّذِیۡنَ هَاجَرُوۡا وَ جٰهَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۲۱۸﴾
যারা সত্যের ওপর ঈমান এনেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যারা প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ (হিজরত) করেছে এবং তাঁর পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা জিহাদ করেছে—তারাই মূলত আল্লাহর রহমতের প্রকৃত প্রত্যাশী। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা বাকারা: ২১৮)
মানুষের ভুল-ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক, তাই মহান আল্লাহ তাঁর নিকট ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
وَّ اسۡتَغۡفِرِ اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ﴿۱۰۶﴾ۚ
“আর তুমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নিসা: ১০৬)
আল্লাহর ক্ষমা কেবল নেককারদের জন্যই নয়, বরং যারা ভুল পথে চলে গিয়েছিল তাদের জন্যও তাঁর দয়ার দ্বার উন্মুক্ত। তিনি ইরশাদ করেন:
اِلَّا مَنۡ ظَلَمَ ثُمَّ بَدَّلَ حُسۡنًۢا بَعۡدَ سُوۡٓءٍ فَاِنِّیۡ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۱۱﴾
“তবে যে জুলুম করে, তারপর অসৎকাজের পরিবর্তে সৎকাজ করে (অর্থাৎ তওবা করে নিজেকে সংশোধন করে নেয়), তবে অবশ্যই আমি অধিক ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নমল: ১১)
ইবাদত পালন বা হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমল শেষেও আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার শিক্ষা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
ثُمَّ اَفِیۡضُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَفَاضَ النَّاسُ وَ اسۡتَغۡفِرُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۱۹۹﴾
অতঃপর তোমরা অন্য মানুষের মতো (আরাফাত থেকে) প্রত্যাবর্তন করো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা বাকারা: ১৯৯)
মূসা (আলাইহিস সালাম) ও মালাকুল মউত
ইসলামের ইতিহাসে নবীগণের জীবনের অনেক ঘটনা আমাদের ইমানকে দৃঢ় করে। এমনই একটি ঘটনা হলো মালাকুল মউত বা মৃত্যুর ফেরেশতার সাথে হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাৎ।
ফেরেশতার আগমন ও মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতিক্রিয়া
আল্লাহ তাআলা একবার মালাকুল মউতকে হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট পাঠালেন। ফেরেশতা যখন মানুষের রূপ ধরে তাঁর সামনে আসলেন, তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে চপেটাঘাত করলেন। এতে ফেরেশতার একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এরপর ফেরেশতা আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে আরজ করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে এমন এক বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন, যে মরতে চায় না।”
আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সুযোগ
আল্লাহ তাআলা ফেরেশতার চোখ সুস্থ করে দিলেন এবং বললেন, “তুমি মূসার কাছে আবার যাও এবং তাকে বলো—সে যেন একটি গরুর পিঠে নিজের হাত রাখে। তার হাতের নিচে যতগুলো পশম পড়বে, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তাকে এক বছর করে অতিরিক্ত আয়ু দেওয়া হবে।”
ফেরেশতা পুনরায় এসে মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে আল্লাহর এই প্রস্তাব জানালেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার প্রতিপালক! এই দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কী হবে?” আল্লাহ বললেন, “অতঃপর মৃত্যু।” তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বিনীতভাবে বললেন, “তাহলে এখনই হোক।” অর্থাৎ যখন মৃত্যুই শেষ পরিণতি, তখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যেতে বিলম্ব কেন?
শেষ ইচ্ছা ও পবিত্র ভূমির সান্নিধ্য
মৃত্যুর পূর্বে তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন যেন তাকে ‘আরযে মুকাদ্দাসা’ বা পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের খুব কাছে—একটি পাথর নিক্ষেপ করলে যতটুকু দূরত্ব হয়, এমন স্থানে মৃত্যু দান করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন, “আমি যদি আজ সেখানে থাকতাম, তবে অবশ্যই তোমাদের রাস্তার পাশে লাল বালির টিলার নিচে মূসার কবরটি দেখিয়ে দিতাম।”
[আবূ হুরায়রা (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, বুখারী হাদিস:৩৪০৭, মুসলিম হাদিস: ২৩৭২]
সাহরি করার সুন্নাত ও নিয়মাবলী
রমজানের রোজা পালনের জন্য সাহরি খাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। হাদিস শরিফে সাহরি খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
‘আমাদের ও আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া।’ (সহিহ মুসলিম)
অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা সাহরি না খেয়ে রোজা রাখে, তাই তাদের থেকে ভিন্নতা বজায় রাখতে এবং সুন্নাত পালনের উদ্দেশ্যে অল্প হলেও সাহরি খাওয়া উচিত। সাহরি খাওয়ার মধ্যে বিশেষ বরকত ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
সাহরি খাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতসমূহ:
১. সাহরি খাওয়ার সময়:
রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতের শেষ প্রহরে সাহরি খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাতের মধ্যভাগে কিংবা সুবহে সাদিকের ঠিক আগ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে সাহরি খাওয়া সুন্নাতের পরিপন্থী। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
‘তোমরা সাহরি বিলম্বে (রাতের শেষভাগে) গ্রহণ করো।’ (তাবারানি)
২. সাহরির উত্তম সময়:
আজানের কিছুক্ষণ আগে সাহরি শেষ করা উত্তম ও সুন্নাত। আনাস রাদ্বিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন:
‘রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহরি গ্রহণ ও ফজর নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করার মতো সময় বাকি থাকত।’ (সহিহ বুখারি)
আধুনিক ফকিহদের মতে, তারতিলের সাথে (ধীরস্থিরভাবে) পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। তাই আজানের ২০ মিনিট আগে সাহরি শেষ করা সুন্নাতসম্মত।
৩. খাবারের পরিমাণ:
সাহরিতে খুব বেশি কিংবা একেবারে নামমাত্র খাবার খাওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত খাবার শরীরে অলসতা তৈরি করে, ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায় এবং ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট অনুভবে বাধা দেয়। অন্যদিকে একেবারে কম খাবার খেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইবাদত করা দুষ্কর হয়। তাই পরিমিত পরিমাণ খাবার গ্রহণ করাই উত্তম পদ্ধতি।
৪. আজান চলাকালীন সাহরি খাওয়া:
রোজার মতো ফরজ ইবাদতের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা জরুরি। সাহরি খাওয়া অবস্থায় যদি আজান শুরু হয়ে যায়, তবে সাথে সাথে খাবার পরিহার করতে হবে। আজান পর্যন্ত সময় নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
৫. সাহরির পর করণীয়:
সাহরি খেয়েই সাথে সাথে শুয়ে পড়া সুন্নাতের পরিপন্থী এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বরং সাহরি শেষ করে জামাআতে নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে যাওয়া উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ রমজানে ফজরের পর মসজিদে ইবাদত করতেন এবং সাহাবীগণকে রাদ্বিআল্লাহু আনহুম দ্বীনি শিক্ষা দিতেন। সূর্যোদয়ের পর ইশরাকের নামাজ আদায় করে তিনি ঘরে ফিরতেন।
মিথ্যা শপথ ও অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাতের পরিণাম
ইসলামী শরীয়তে মিথ্যা বলা যেমন জঘন্য অপরাধ, আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা তার চেয়েও ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন:
«من خلف على يمين صبر يقطع بها مال امرئ مسلم وهو فيها وهو عليه غضبان» الله فاجر لقي
“যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে এবং তার মাধ্যমে কোনো মুসলিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে, সে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ তার ওপর অত্যন্ত ক্রোধান্বিত থাকবেন।” [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৪৭]
এই হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মিথ্যা শপথের মাধ্যমে দুনিয়াবি ফায়দা হাসিল করা গেলেও পরকালে আল্লাহর ভয়াবহ অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।
মিথ্যা শপথ কেবল সাধারণ কোনো ভুল নয়, বরং এটি ধ্বংসাত্মক কবীরা গুনাহসমূহের একটি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«الكبائر : الإشراك بالله وعقوق الوالدين وقتل النفس واليمين
“কবীরা গুনাহ হলো—আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতা-পিতার নাফরমানী করা, মানুষ হত্যা করা এবং মিথ্যা শপথ করা।” [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১৮২]
রমাদানের রাতগুলো সালাফদের কাছে ছিল এক বিশেষ আলোকময় অধ্যায়—যেখানে দিনের ব্যস্ততা ও চিন্তা দূরে সরে যেত, আর কেবল কুরআনের আয়াত ও ইবাদতের গভীর সান্নিধ্য ভর করে দিত হৃদয়। প্রতিটি রাত যেন এক নতুন সুযোগ, প্রতিটি আয়াত যেন নূরের একটি কিরণ, যা আত্মার অন্ধকার দূর করে আলোকিত করত।
সায়িব ইবনু ইয়াযীদ (রহ.) বর্ণনা করেন—
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) হযরত উবাই ইবনু কা‘ব এবং তামিম আদ-দারী (রাদ্বিআল্লাহু আনহুমা)-কে রমাদান মাসে কিয়ামুল লাইল পরিচালনার দায়িত্ব দেন। দীর্ঘ কিরাআতের কারণে সাহাবিরা লাঠির ওপর ভর দিয়ে নামাযের সময় পার করতেন, এবং ফজরের আগে নামায শেষ হতো না।
— ইমাম বায়হাকি, সুনানুল কুবরা, হাদিস নং: ৪৩৯২