শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার নির্দেশ
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তার প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে পৃথিবীর পবিত্র ও হালাল বস্তু আহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে সতর্ক করেছেন যেন কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে। কারণ শয়তান মানুষের জন্য এক সুস্পষ্ট শত্রু, যে সবসময় মন্দ পথের দিকে প্ররোচিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۱۶۸﴾
হে মানবজাতি, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু। (সুরা বাকারা-১৬৮)
মুমিনদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো, তারা যেন খণ্ডিতভাবে নয় বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে পূর্ণরূপে প্রবেশ করে। এই পথে শয়তানের কোনো প্ররোচনাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, কারণ সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য ওত পেতে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۲۰۸﴾
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। (সুরা বাকারা-২০৮)
শয়তান মানুষকে দান-সদকা থেকে বিরত রাখতে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তাকে অশ্লীল ও পাপের কাজে লিপ্ত হওয়ার আদেশ দেয়। অন্যদিকে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন,
اَلشَّیۡطٰنُ یَعِدُکُمُ الۡفَقۡرَ وَ یَاۡمُرُکُمۡ بِالۡفَحۡشَآءِ ۚ وَ اللّٰهُ یَعِدُکُمۡ مَّغۡفِرَۃً مِّنۡهُ وَ فَضۡلًا ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۶۸﴾ۖۙ
শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্রতার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সুরা বাকারা-২৬৮)
শয়তান মুমিনদের অন্তরে তার বন্ধুদের (কাফের, মুশরিক ও মুনাফিক) মাধ্যমে ভীতি ছড়াতে চায়। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ হলো—প্রকৃত মুমিনরা যেন সেই মিথ্যা ভয়কে উপেক্ষা করে এবং একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে।
اِنَّمَا ذٰلِکُمُ الشَّیۡطٰنُ یُخَوِّفُ اَوۡلِیَآءَهٗ ۪ فَلَا تَخَافُوۡهُمۡ وَ خَافُوۡنِ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ﴿۱۷۵﴾
সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের (কাফের, মুশরিক, মুনাফিক) ভয় দেখায়। তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও। (সুরা আলে ইমরান-১৭৫)
জাবের (রাদ্বিআল্লাহু আনহু )-এর মেহমানদারী ও রাসূল (ﷺ)-এর মু’জিযা
আরবের তপ্ত মরুপ্রান্তরে তখন চলছে পরিখা খননের কঠিন লড়াই। চারদিকে ধুলাবালি আর ক্ষুধার হাহাকার। সাহাবায়ে কেরাম পেটে পাথর বেঁধে মাটি কেটে চলছেন। হযরত জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু সেই সময়ের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি বর্ণনা করেন—
খনন কাজ চলাকালে হঠাৎ একটি বিশালাকার শক্ত পাথর বাধা হয়ে দাঁড়াল। কোনোভাবেই তা ভাঙা যাচ্ছিল না। খবর পেয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ নিজেই খন্দকের নিচে নেমে এলেন। দীর্ঘ তিনদিন কোনো দানাপানি পেটে পড়েনি তাঁর; তীব্র ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু মহাবিক্রমে কোদাল দিয়ে আঘাত করতেই সেই দুর্ভেদ্য পাথরটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হলো।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষুধার্ত অবয়ব দেখে জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি চুপিচুপি বাড়ি গিয়ে স্ত্রীকে বললেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বড় ক্ষুধার্ত দেখলাম, ঘরে কি কিছু আছে?” স্ত্রী এক ‘ছা’ যব বের করে দিলেন। জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু তাঁর পালিত একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করলেন আর স্ত্রী যব পিষে আটা তৈরি করলেন। রান্নার হাঁড়ি চুলায় চড়িয়ে জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু ভাবলেন—এই সামান্য খাবারে বড়জোর পাঁচ-ছয়জন খেতে পারবে।
তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কানে কানে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি জনাকয়েক সঙ্গী নিয়ে আমার বাড়িতে চলুন, সামান্য একটু খাবারের ব্যবস্থা করেছি।”
কিন্তু আল্লাহর রাসূল ﷺ ছিলেন গোটা উম্মাহর অভিভাবক। তিনি উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বললেন, “হে পরিখা খননকারী দল! চলো, জাবের তোমাদের সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছে!” প্রায় এক হাজার ক্ষুধার্ত সৈনিকের কাফেলা জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু-এর বাড়ির দিকে রওনা হলো। জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু ভয়ে অস্থির হয়ে স্ত্রীকে বললেন, “সর্বনাশ! নবীজি যে এক হাজার সাহাবীকে নিয়ে আসছেন!” কিন্তু তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধৈর্যশীলা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ কি জানেন আমাদের খাবারের পরিমাণ কতটুকু?” জাবের (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) যখন বললেন “হ্যাঁ”, তখন স্ত্রী আশ্বস্ত হলেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ জাবেরের বাড়ি পৌঁছে নির্দেশ দিলেন তাঁর আসার আগে যেন ডেকচি না নামানো হয়। তিনি আটার খামিরে এবং ফুটন্ত তরকারিতে নিজের পবিত্র লালা মিশিয়ে আল্লাহর কাছে বরকতের দোয়া করলেন। এরপর শুরু হলো সেই অবিশ্বাস্য মু’জিযা।
সারিবদ্ধভাবে সাহাবীরা খেতে বসলেন। হাজারো মানুষ তৃপ্তিভরে পেট ভরে খেলেন। জাবের রাদ্বিআল্লাহু আনহু অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, এক হাজার মানুষ খেয়ে চলে যাওয়ার পরও চুলার ওপর ডেকচি ভর্তি তরকারি আগের মতোই টগবগ করে ফুটছে এবং আটার খামির থেকে আগের মতোই রুটি তৈরি হচ্ছে—খাবার একটুও কমেনি!
[মিশকাত হাদিস : ৫৮৭৭, ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়, ‘মু’জিযা’ অনুচ্ছেদ]
অযুর সুন্নাত তরিকা
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক অযু করার সঠিক ও সুন্নাতসম্মত পদ্ধতিগুলো নিচে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো:
১. প্রারম্ভিক কাজ ও নিয়ত
* নিয়ত করা: অযুর শুরুতে মনে মনে পবিত্রতা অর্জনের নিয়ত করা সুন্নাত।
* বিসমিল্লাহ পাঠ: অযু শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা।
২. হাত ও মুখ পরিষ্কার করা
* কব্জি ধৌত করা: ডান হাতে পানি নিয়ে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা এবং হাতের আঙ্গুলসমূহ খিলাল করা।
* কুলি ও নাক পরিষ্কার: ডান হাতে পানি নিয়ে ভালোভাবে কুলি করা। প্রয়োজনে নতুন পানি নিয়ে নাকে দেওয়া এবং বাম হাত দিয়ে ভালোভাবে নাক ঝাড়া।
৩. মুখমন্ডল ধৌত করা ও দাড়ি খিলাল
* মুখমন্ডল ধোয়া: কপালের চুলের গোড়া থেকে দুই কানের লতি হয়ে থুতনির নিচ পর্যন্ত পুরো মুখমন্ডল ধৌত করা।
* দাড়ি খিলাল: এক অঞ্জলি পানি নিয়ে থুতনির নিচে দিয়ে দাড়ি খিলাল করা। দাড়ি যদি ঘন হয়, তবে শুধু উপরের অংশ ধোয়া জরুরি; ভেতরে পানি পৌঁছানো আবশ্যিক নয়। তবে দাড়ি পাতলা হলে চামড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছানো জরুরি।
৪. হাত ও মাথা মাসাহ
* হাত ধোয়া: প্রথমে ডান হাত এবং পরে বাম হাত কনুই সমেত ভালোভাবে ধৌত করা।
* মাথা মাসাহ: নতুন পানি নিয়ে দুই হাতের ভিজা আঙ্গুলগুলো মাথার সম্মুখ ভাগ হতে পিছনে এবং পিছন হতে পুনরায় সম্মুখে বুলিয়ে একবার পুরো মাথা মাসাহ করা।
* কান মাসাহ: মাথার সাথেই ভিজা শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা কানের ভেতরের অংশ এবং বুড়ো আঙ্গুল দ্বারা কানের পিছনের অংশ মাসাহ করা।
৫. পা ধৌত করা ও সমাপ্তি
* পা ধোয়া: প্রথমে ডান পা এবং পরে বাম পা টাখনু সমেত ভালোভাবে ধৌত করা।
* আঙ্গুল খিলাল: পা ধোয়ার সময় বাম হাতের আঙ্গুল দ্বারা পায়ের আঙ্গুলসমূহ খিলাল করা।
* দোয়া পাঠ: অযু শেষ করার পর সুন্নাতসম্মত দোয়া (যেমন: কালেমা শাহাদাত) পাঠ করা।
পুরুষ ও মহিলার বেশ ধারণ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে নারী ও পুরুষের স্বকীয়তা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের বেশ বা পোশাক ধারণ করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা বলা বা চাল-চলনে বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণ করাকে জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এসেছে:
النساء بالرجال والمتشبهين من الرجال من المتشبهات الله لعن
“আল্লাহ তা’আলা পুরুষের বেশ ধারণকারী মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন এবং মহিলাদের বেশ ধারণকারী পুরুষদের উপর অভিশাপ করেছেন।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৫৭৪]
এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, পুরুষ ও নারীর জন্য নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী সাজ-সজ্জা বা বেশ ধারণ করা মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও অভিশাপের কারণ।
রমাদান সালাফদের কাছে ছিল শুধু রোজার মাস নয়—এটি ছিল দানের, উদারতার এবং নেক আমলের এক পূর্ণাঙ্গ সময়। প্রতিটি মুহূর্তকে তারা ব্যবহার করতেন অন্যের কল্যাণে, প্রতিটি রাতকে ভরাতেন আত্মশুদ্ধি ও তিলাওয়াতের আলোয়।
হযরত হাম্মাদ ইবনু আবি সুলাইমান (রহ.) রমাদান মাসে প্রতিদিন পাঁচশ’ মানুষকে ইফতার করাতেন। ঈদের পর তিনি প্রত্যেককে একশ’ দিরহাম করে দান দিতেন—এক উদার, দয়ার দৃষ্টান্ত যা নেক আমল ও পরোপকারের মহিমা ফুটিয়ে তোলে।
— ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৫/২৩৪