জিহাদ
পবিত্র কুরআন মজিদে আল্লাহ তা‘আলা জিহাদ এবং আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার মর্যাদা ও নিয়মাবলী স্পষ্ট করেছেন।
১. শহীদদের চিরন্তন জীবন ও মর্যাদা
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যারা নিজের জীবন বিলিয়ে দেন, তাদের সাধারণ মৃতদের মতো মনে করা অনুচিত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
وَ لَا تَقُوۡلُوۡا لِمَنۡ یُّقۡتَلُ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ اَمۡوَاتٌ ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ وَّ لٰکِنۡ لَّا تَشۡعُرُوۡنَ ﴿۱۵۴﴾
“আর যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।” [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৪]
২. আত্মরক্ষামূলক লড়াই ও সীমালঙ্ঘন বর্জন
ইসলামে জিহাদ বা লড়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং অন্যায়ের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা নিরপরাধের ওপর আক্রমণ করা নিষিদ্ধ। ইরশাদ হয়েছে:
وَ قَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ وَ لَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ﴿۱۹۰﴾
“আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৯০]
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করা এক অনন্য উচ্চতার সম্মান। একই সাথে ইসলাম যুদ্ধের ময়দানেও ইনসাফ কায়েম রাখার এবং সীমালঙ্ঘন না করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করে।
মুহাম্মাদ (ﷺ) ই একমাত্র শাফা’আতকারী
হযরত আনাস রাদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত এক মহিমান্বিত হাদীসে কিয়ামতের কঠিন পরিস্থিতির সেই দৃশ্য ফুটে উঠেছে, যখন সৃষ্টির সেরা মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর উম্মতের জন্য পরম আশ্রয়দাতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিনে মুমিনগণ যখন হাশরের ময়দানে দীর্ঘ সময় বন্দী থাকবেন, তখন তাঁদের অস্থিরতা চরমে পৌঁছাবে। অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা একজন সুপারিশকারী খুঁজবেন, যিনি আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করে এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি দেবেন।
তাঁরা প্রথমে আদম আলাইহিস সালাম-এর নিকট যাবেন। কিন্তু তিনি নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে নিজেকে অনুপযুক্ত বলবেন এবং নূহ আলাইহিস সালাম-এর কাছে যেতে বলবেন।
নূহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে নিজ পুত্রের জন্য বিশেষ প্রার্থনার কথা স্মরণ করে অপারগতা প্রকাশ করবেন এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কাছে পাঠাবেন।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম জীবনের তিনটি বিশেষ উক্তির কথা স্মরণ করে নিজেকে যোগ্য মনে করবেন না এবং মূসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে পাঠাবেন।
মূসা আলাইহিস সালাম নিজের হাতে এক ব্যক্তির প্রাণনাশের ঘটনার কথা স্মরণ করে সুপারিশ করতে ভয় পাবেন এবং ঈসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেবেন।
ঈসা আলাইহিস সালাম বলবেন, “আমি এর উপযুক্ত নই, বরং তোমরা মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে যাও, যাঁর আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
অবশেষে সমস্ত মানুষ নবী করীম ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি চাইবেন। অনুমতি পেয়ে আল্লাহকে দেখামাত্রই তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন। আল্লাহ তা‘আলা যতক্ষণ চাইবেন, নবীজি ﷺ সিজদাবনত অবস্থায় রবের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতে থাকবেন।
অতঃপর আল্লাহ বলবেন, “হে মুহাম্মাদ! মাথা ওঠাও। বলো, তোমার কথা শোনা হবে; সুপারিশ করো, কবুল করা হবে; চাও, তোমাকে দেওয়া হবে।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ মাথা উঠাবেন এবং আল্লাহর শেখানো বিশেষ হামদ বা প্রশংসা করবেন। এরপর তিনি তিন দফায় সুপারিশ করবেন:
* প্রথমবার: আল্লাহ একটি সীমা নির্ধারণ করে দেবেন, সেই অনুযায়ী তিনি একদল লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
* দ্বিতীয়বার: পুনরায় সিজদায় পড়ে রবের দরবারে আরজি জানাবেন এবং দ্বিতীয় সীমার লোকদের মুক্ত করবেন।
* তৃতীয়বার: একইভাবে তৃতীয়বারের মতো সুপারিশ করে আরও একদল উম্মতকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।
সবশেষে কেবল তারাই জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে, যাদের জন্য কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী চিরস্থায়ী জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে গেছে। এরপর নবীজি ﷺ সূরা বনী ইসরাঈলের ৭৯ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করে বললেন, এটাই সেই ‘মাকামে মাহমূদ’ বা প্রশংসিত স্থান, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন।
[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৭৪৪০]
চুল রাখার সুন্নাত ও শরয়ী পদ্ধতি
ইসলামে মানুষের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য চর্চার প্রতিটি বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুসরণ করে চুল রাখা কেবল একটি ফ্যাশন নয়, বরং একটি ইবাদত।
পুরুষদের জন্য চুল রাখার সুন্নাত পদ্ধতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ সাধারণত তিন পদ্ধতিতে বাবরী চুল রাখতেন। এগুলো হলো:
* উভয় কাঁধ বরাবর: চুল লম্বা হয়ে দুই কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছানো।
* ঘাড়ের মাঝামাঝি: চুল কাঁধের উপরে এবং ঘাড়ের মাঝামাঝি অংশ পর্যন্ত রাখা।
* উভয় কানের লতি: চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত লম্বা রাখা।
(সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪১৮৩-৪১৮৭)
মাথা মুণ্ডানো ও ছোট করার বিধান:
* মাথা মুণ্ডানো: হজ বা উমরার এহরাম থেকে হালাল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ মাথা মুণ্ডাতেন।
* আংশিক চুল কাটা: মাথার কিছু অংশ মুণ্ডানো এবং কিছু অংশ রেখে দেওয়া (যাকে হাদীসে ‘কাজা’ বলা হয়েছে) কঠোরভাবে নিষেধ।
* সমতা রক্ষা: চুল যদি সুন্নাত তরিকায় বাবরী না রাখা হয়, তবে পুরো মাথার চুল সমানভাবে ছোট করে রাখা জায়েজ। কিন্তু সামনে বড় বা পেছনে বড় রাখা, কিংবা ডানে-বামে ছোট-বড় করে রাখা উচিত নয়।
* অন্য জাতির অনুকরণ: কোনো কাটিং যদি ভিন্ন ধর্মের বা বিজাতীয় কৃষ্টির অনুকরণে হয়, তবে তা নাজায়েজ বলে গণ্য হবে।
মহিলাদের জন্য নির্দেশিকা:
নারীদের সৌন্দর্য ও শালীনতার অন্যতম অংশ হলো তাঁদের চুল। তাঁদের জন্য চুল রাখার বিষয়ে কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে:
* কাটা বা মুণ্ডানো নিষেধ: মেয়েদের জন্য মাথা ন্যাড়া করা বা ছেলেদের মতো করে চুল ছোট করে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
* দৈর্ঘ্য: চুল এতো বড় রাখা উচিত নয় যা গোসলের সময় পানি পৌঁছাতে কষ্টসাধ্য করে তোলে। সাধারণত পিঠ বা কোমর পর্যন্ত রাখা উত্তম।
* অতিরিক্ত অংশ কাটা: কোমরের নিচে ঝুলে থাকা অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলা জায়েজ, তবে না কাটলেও কোনো সমস্যা নেই।
(সূত্র: তিরমিজি শরিফ ১/১৮২, মুসলিম শরিফ ১/১৪৮)
তাকদীরকে অস্বীকার করার পরিণাম
তাকদীর বা ভাগ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। তাকদীরকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্দেহ পোষণ করা ঈমান নষ্টের কারণ হতে পারে। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে অত্যন্ত কঠোর সর্তকবাণী এসেছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন—
«لو ان الله تعالى عذب أهل سماواته وأرضيه لعذبهم وهو غير ظالم لهم ولورحمهم كانت رحمته خيرا لهم من أعمالهم ولوكان لرجل أحد أو مثل أحد ذهبا ينفقه في سبيل الله لا يقبله الله عزوجل منه حتى يؤمن بالقدر خيره شره ويعلم أن ما أصابه لم يكن ليخطئه هذا وما أخطأه لم يكن ليصيبه وإنك إن مت على غيرادخلت النار».
“যদি আল্লাহ তা’আলা আসমান ও যমীনের সকল অধিবাসীকে আযাব দেন, তাহলে তাঁর আযাব দেওয়াটা কোনো প্রকার অন্যায় হবে না। আর যদি তিনি দয়া করেন, তবে তা তাদের আমলের তুলনায় অনেক বেশি হবে। যদি কোনো ব্যক্তির নিকট ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, আল্লাহ তার এ দান বিন্দু পরিমাণও গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে।” ব্যক্তিকে বিশ্বাস করতে হবে— তার জীবনে যা ঘটেছে বা সে যা লাভ করেছে, তা আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালা অনুযায়ীই হয়েছে এবং তা তাকে ছেড়ে যাওয়ার ছিল না। আর যা সে পায়নি বা যা থেকে সে রক্ষা পেয়েছে, তা কখনও তার কাছে পৌঁছানোর ছিল না। “যদি তুমি এই (তাকদীরের) বিশ্বাসের বাইরে মৃত্যুবরণ করো, তবে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”
কিতাবুস সুন্নাহ: ইবন আবী আসিম আশ-শায়বানী]
তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রতিটি বিষয় আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বলে বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। এটি মানুষকে বিপদে ধৈর্য ধরতে এবং সুসময়ে কৃতজ্ঞ থাকতে সাহায্য করে।
রমাদানের শেষ দশ দিন সালাফদের কাছে ছিল বিশেষ পূণ্য ও অনুপ্রেরণার সময়—যেখানে রাতের ইবাদত এবং দিনের অন্যান্য নেক আমলকে আরও নিবিষ্ট ও প্রাণবন্ত করার মাধ্যমে আত্মাকে আলোকিত করা হতো।
ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন—
“রমাদানের শেষ দশ দিনে ইবাদত-বন্দেগির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া এবং এর প্রতিটি রাত ইবাদতের মাধ্যমে সজাগ ও প্রাণবন্ত রাখা বিশেষভাবে মুস্তাহাব।”
— ডক্টর কামিল সুবহি সালাহ, হালুস সালাফি ফী শাহরি রমাদানাল মুবারাক, পৃ. ২৬, alukah.net