ইমান
لَیۡسَ الۡبِرَّ اَنۡ تُوَلُّوۡا وُجُوۡهَکُمۡ قِبَلَ الۡمَشۡرِقِ وَ الۡمَغۡرِبِ وَ لٰکِنَّ الۡبِرَّ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ وَ الۡکِتٰبِ وَ النَّبِیّٖنَ ۚ وَ اٰتَی الۡمَالَ عَلٰی حُبِّهٖ ذَوِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنَ وَ ابۡنَ السَّبِیۡلِ ۙ وَ السَّآئِلِیۡنَ وَ فِی الرِّقَابِ ۚ وَ اَقَامَ الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَی الزَّکٰوۃَ ۚ وَ الۡمُوۡفُوۡنَ بِعَهۡدِهِمۡ اِذَا عٰهَدُوۡا ۚ وَ الصّٰبِرِیۡنَ فِی الۡبَاۡسَآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ حِیۡنَ الۡبَاۡسِ ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا ؕ وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡمُتَّقُوۡنَ ﴿۱۷۷﴾
সৎকর্ম শুধু এ নয় যে, তোমরা তোমাদের মুখ পূর্ব বা পশ্চিমের দিকে ফেরাবে; বরং প্রকৃত সৎকর্ম হলো— যে ব্যক্তি আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনে; আর আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের প্রিয় সম্পদ দান করে আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, প্রার্থনাকারী এবং দাসমুক্তির জন্য; যে সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে; চুক্তি করলে তা পূর্ণ করে; এবং দারিদ্র্য, দুঃখ-কষ্ট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণ করে— তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকি। [সুরা বাকারা-১৭৭]
اَللّٰهُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ یُخۡرِجُهُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ۬ؕ وَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَوۡلِیٰٓـُٔهُمُ الطَّاغُوۡتُ ۙ یُخۡرِجُوۡنَهُمۡ مِّنَ النُّوۡرِ اِلَی الظُّلُمٰتِ ؕ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ هُمۡ فِیۡهَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۵۷﴾
আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফর করে, তাদের অভিভাবক হলো তাগুত; তারা তাদের আলো থেকে অন্ধকারের দিকে টেনে নেয়। তারা জাহান্নামের অধিবাসী—সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। [সুরা বাকারা-২৫৭]
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اٰمِنُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ الۡکِتٰبِ الَّذِیۡ نَزَّلَ عَلٰی رَسُوۡلِهٖ وَ الۡکِتٰبِ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ مِنۡ قَبۡلُ ؕ وَ مَنۡ یَّکۡفُرۡ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓئِکَتِهٖ وَ کُتُبِهٖ وَ رُسُلِهٖ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا ﴿۱۳۶﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল, তাঁর রাসূলের ওপর নাযিলকৃত কিতাব এবং পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনো। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং পরকালকে অস্বীকার করে—সে তো চরম পথভ্রষ্টতায় পতিত হলো।[সুরা নিসা-১৩৬]
পাহাড়ের গুহায় আঁটকে পড়া তিন যুবক
তিনজন লোক পথ চলছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে তারা পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। এমন সময় ওপর থেকে একটি বিশাল পাথর পড়ে গুহার মুখটি বন্ধ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারলেন, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা কোনো সৎকাজের উসিলা দিয়ে দোয়া করা ছাড়া এখন আর মুক্তির কোনো পথ নেই।
প্রথম ব্যক্তির ঘটনা:
তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আমার বৃদ্ধ বাবা-মা এবং ছোট ছোট সন্তান ছিল। আমি পশু পালন করে সংসার চালাতাম। প্রতিদিন রাতে সন্তানদের আগে বাবা-মাকে দুধ পান করানো ছিল আমার নিয়ম। একদিন ফিরতে দেরি হওয়ায় দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধের পাত্র হাতে তাঁদের শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু তাঁদের ঘুম ভাঙানো বা তাঁদের আগে সন্তানদের পান করানো পছন্দ করিনি। অথচ ক্ষুধার্ত বাচ্চারা আমার পায়ের কাছে পড়ে কাঁদছিল। এভাবে দাঁড়িয়ে থেকেই ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ! যদি আমি কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্য এটি করে থাকি, তবে পাথরটি কিছুটা সরিয়ে দিন।” তখন পাথরটি সামান্য সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেলেন।
দ্বিতীয় ব্যক্তির ঘটনা:
দ্বিতীয়জন বললেন, “হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল, যাকে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম। একবার আমি তার সাথে লিপ্ত হতে চাইলে সে একশ দিনার দাবি করল। অনেক কষ্টে সেই অর্থ জোগাড় করে যখন আমি তার অতি নিকটে বসলাম, তখন সে বলল— ‘আল্লাহকে ভয় করো, অন্যায়ভাবে আমার সতীত্ব নষ্ট করো না।’ আপনার ভয়ে আমি তখনি সেখান থেকে উঠে দাঁড়ালাম। হে আল্লাহ! যদি আমি কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্য এই পাপ থেকে বিরত হয়ে থাকি, তবে পাথরটি সরিয়ে দিন।” তখন পাথরটি আরও কিছুটা সরে গেল।
তৃতীয় ব্যক্তির ঘটনা:
তৃতীয় ব্যক্তি বললেন, “হে আল্লাহ! আমি সামান্য চালের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিয়োগ করেছিলাম। কাজ শেষে সে মজুরি না নিয়েই চলে যায়। আমি সেই পাওনা কাজে লাগিয়ে অনেক গরু ও রাখাল গড়ে তুলি। দীর্ঘ সময় পর সে ফিরে এসে তার পাওনা চাইলে আমি তাকে সব গরু ও রাখাল দিয়ে দিলাম। সে ভেবেছিল আমি ঠাট্টা করছি, কিন্তু আমি তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য এটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকি অংশটুকু সরিয়ে দিন।” তখন পাথরটি পুরোপুরি সরে গেল এবং তারা মুক্ত হলেন।
[সূত্র: বুখারি ২৩৩৩, মুসলিম ২৭৪৩]
শিক্ষা:
- বিপদে-আপদে সর্বদা আল্লাহকে ডাকা।
- সৎ কাজের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
- বাবা-মায়ের সেবা করা এবং তাঁদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
- শ্রমিকের পাওনা ও আমানত সততার সাথে বুঝিয়ে দেওয়া।
মিসওয়াক
মিসওয়াক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। যে সময়গুলোতে মিসওয়াক করা সুন্নাত:
১. প্রত্যেক সালাতের আগে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে তাদের প্রত্যেক সালাতের আগে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।”
২. ঘরে প্রবেশের সময়।
৩. ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর।
৪. কুরআন তিলাওয়াত করার সময়।
৫. মুখের দুর্গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তন হলে।
৬. অজু করার সময়।
আল্লাহর সাথে কাউকে শিরক করা
শিরক দুই প্রকার:
১. শিরকে আকবার হলো আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কোনো কিছুর ইবাদত করা অথবা ইবাদতের যেকোনো অংশ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদন করা; যেমন—আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু জবেহ করা। কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি তাতে অন্য কিছুকে শরিক করে, তবে সেটিও শিরক হিসেবে গণ্য হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ﴾ [النساء: ٤٨]
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; তবে শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]
২. শিরকে আসগর বা ছোট শিরক: লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোনো আমল বা ইবাদত করা; যেমন—রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত ইত্যাদি।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَوَيۡلٞ لِّلۡمُصَلِّينَ ٤ ٱلَّذِينَ هُمۡ عَن صَلَاتِهِمۡ سَاهُونَ ٥ ٱلَّذِينَ هُمۡ يُرَآءُونَ ٦﴾ [الماعون: ٤، ٦]
“অতএব, দুর্ভোগ সেই সব সালাত আদায়কারীর জন্য, যারা নিজেদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন এবং যারা তা কেবল লোক দেখানোর জন্য করে।” [সূরা আল-মা‘উন, আয়াত: ৪-৬]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
«أٍنا أغنى الشركاء عن الشرك من عمل عملا اشرك معي فيه غيري تركته وشركه»
“আমি অংশীদারদের শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি কেউ কোনো কাজ করে এবং তাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, তবে আমি তাকে ও তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৯৮৫]
রমাদানের প্রথম রাত—চারদিকে নেমে আসে প্রশান্ত এক পবিত্র আবহ। মসজিদ ভরে ওঠে তিলাওয়াতের সুরে, আর প্রদীপের আলো যেন সাক্ষ্য দেয় ইবাদতের জাগরণের।
হযরত আবু ইসহাক আল-হামদানি (রহ.) বর্ণনা করেন—রমাদান মাসের প্রথম রাতে হযরত আলি ইবনে আবি তালিব (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) বের হলেন। দেখলেন, মসজিদের প্রদীপগুলো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে এবং তারাবিহর সালাতে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করা হচ্ছে। সে দৃশ্য দেখে তিনি আবেগভরে বললেন,
“হে ওমর ইবনুল খাত্তাব! আল্লাহ আপনার কবরে তেমন আলো দান করুন, যেমন আপনি আল্লাহর মসজিদগুলোকে কোরআনের আলো দিয়ে আলোকিত করেছেন।”
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ. ৭