জাহান্নাম
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ তা‘আলা সত্য অস্বীকারকারী ও জালেমদের জন্য নির্ধারিত জাহান্নামের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। এই আয়াতগুলো মূলত মানুষের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।
আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন যে,
سَنُلۡقِیۡ فِیۡ قُلُوۡبِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوا الرُّعۡبَ بِمَاۤ اَشۡرَکُوۡا بِاللّٰهِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِهٖ سُلۡطٰنًا ۚ وَ مَاۡوٰىهُمُ النَّارُ ؕ وَ بِئۡسَ مَثۡوَی الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۱۵۱﴾
যারা কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁর একত্ববাদকে অস্বীকার করে অন্যকে তাঁর অংশীদার (শিরক) বানায়, অচিরেই তিনি তাদের অন্তরে এক গভীর ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করবেন। দুনিয়াতে লাঞ্ছনার পাশাপাশি পরকালে তাদের চূড়ান্ত আবাস হবে জাহান্নামের লেলিহান আগুন। বস্তুত, জালেমদের জন্য এর চেয়ে নিকৃষ্ট ও ভয়ংকর ঠিকানা আর কিছুই হতে পারে না। (সূরা আলে ইমরান: ১৫১)
জাহান্নামের শাস্তি কেবল শারীরিক যন্ত্রণাই নয়, বরং এটি এক চরম মানসিক লাঞ্ছনাও বটে। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় মুমিনদের একটি প্রার্থনা এভাবে এসেছে—
رَبَّنَاۤ اِنَّکَ مَنۡ تُدۡخِلِ النَّارَ فَقَدۡ اَخۡزَیۡتَهٗ ؕ وَ مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ ﴿۱۹۲﴾
হে আমাদের রব! আপনি যাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করলেন, তাকে মূলত আপনি চিরতরে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করলেন। সেদিন সেই অপরাধী জালেমদের বাঁচাতে কোনো সাহায্যকারী বা বন্ধু এগিয়ে আসবে না। (সূরা আলে ইমরান: ১৯২)
যারা মহান আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অগ্রাহ্য করে, তাদের শাস্তির তীব্রতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِنَا سَوۡفَ نُصۡلِیۡهِمۡ نَارًا ؕ کُلَّمَا نَضِجَتۡ جُلُوۡدُهُمۡ بَدَّلۡنٰهُمۡ جُلُوۡدًا غَیۡرَهَا لِیَذُوۡقُوا الۡعَذَابَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ عَزِیۡزًا حَکِیۡمًا ﴿۵۶﴾
অচিরেই তিনি তাদের জাহান্নামের আগুনে জ্বালিয়ে দেবেন। আগুনের প্রচণ্ড তাপে যখন তাদের শরীরের চামড়াগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তখন তিনি পুনরায় সেখানে নতুন চামড়া সৃষ্টি করে দেবেন। এই ধারাবাহিকতা চলতেই থাকবে যেন তারা প্রতি মুহূর্তে শাস্তির পূর্ণ স্বাদ অনুভব করতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ চির শক্তিশালী ও প্রজ্ঞাবান। (সূরা নিসা: ৫৬)
একজন খুনীর তওবা ও জান্নাত লাভ
বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির জীবন ছিল পাপে ঘেরা; সে একে একে নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করেছিল। একসময় তার মনে অনুশোচনা জাগল এবং সে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করল। তাকে এক খ্রিষ্টান পাদ্রীর কথা বলা হলে সে তার কাছে গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলল, “আমি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করেছি। এখন আমার জন্য কি তওবার কোনো সুযোগ আছে?” পাদ্রী উত্তর দিল, “না, নেই।” নিরাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে লোকটি সেই পাদ্রীকেও হত্যা করল এবং তার খুনের সংখ্যা একশতে পূর্ণ হলো।
লোকটি আবারও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেমের খোঁজ করতে লাগল। এবার তাকে একজন প্রকৃত আলেমের কথা বলা হলো। সে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, “আমি একশ জন মানুষকে হত্যা করেছি, এখন আমার জন্য কি তওবার কোনো পথ খোলা আছে?” সেই আলেম পরম মমতায় বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। তওবা করতে তোমাকে কে বাধা দিতে পারে? তবে তোমার নিজের এলাকাটি ভালো নয়, তুমি বরং অমুক জায়গায় চলে যাও। সেখানে একদল লোক আল্লাহর ইবাদত করছে, তুমিও তাদের সাথে ইবাদতে মগ্ন হও এবং নিজের দেশে আর ফিরে যেয়ো না।”
লোকটি আলেমের নির্দেশ অনুযায়ী সেই ভালো জায়গাটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু অর্ধেক পথ যেতেই তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে সে তার বুক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল। তার মৃত্যুর পর রহমতের ফেরেশতা এবং আযাবের ফেরেশতাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হলো। রহমতের ফেরেশতা বললেন, “এ লোকটি খাঁটি তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে।” আযাবের ফেরেশতা প্রতিবাদ করে বললেন, “সে জীবনে কখনো কোনো ভালো কাজ করেনি।”
এমন সময় মানুষের রূপ ধরে অন্য এক ফেরেশতা আসলেন এবং তারা তাঁকে শালিস মানলেন। তিনি ফয়সালা দিলেন, “তোমরা দুই দিকের দূরত্ব মেপে দেখো। যে দিকটি কাছে হবে, সে সেই দিকের অন্তর্ভুক্ত হবে।” তখন আল্লাহ তাআলা এক অলৌকিক নির্দেশ দিলেন—তিনি সামনের ভূমিকে বললেন মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী হতে এবং পেছনের ভূমিকে বললেন দূরে সরে যেতে। পরিমাপ করার পর দেখা গেল, লোকটি যে ভালো জায়গার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল, সেদিকের দূরত্ব মাত্র এক বিঘত পরিমাণ কম। ফলে রহমতের ফেরেশতারা তার জান কবজ করলেন এবং তাকে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
[আবু সাঈদ খুদরী (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, বুখারী হাদিস: ৩৪৭০, মুসলিম হাদিস : ২৭৬৬, মিশকাত হাদিস: ২৩২৭]
পানি পান করার ৮টি সুন্নাত
ইসলামি জীবনদর্শনে পানি পান করার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু শিষ্টাচার ও সুন্নাত পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে যেমন সওয়াব হাসিল হয়, তেমনি পানিবাহিত নানা রোগ থেকে বেঁচে থাকা এবং পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করা সম্ভব হয়। পানি পান করার ৮টি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হলো:
১. পানির পাত্র ব্যবহার করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ পানির উৎসে সরাসরি মুখ ডুবিয়ে পান করার পরিবর্তে পাত্রে নিয়ে পান করতে বলেছেন। কেননা সরাসরি উৎসে মুখ দিলে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি ﷺ বলেন:
“তোমাদের কেউ যেন কুকুরের মতো পানিতে মুখ দিয়ে পান না করে, এক হাতেও যেন পানি পান না করে—যেমন একদল করে থাকে যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৩১)
২. পরিষ্কার পাত্রে পান করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ পানির পাত্র সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ﷺ বলেছেন:
“রাতের বেলা পানপাত্র আন্দোলিত না করে (পরিষ্কার না করে) যেন পানি পান না করে। তবে পাত্র ঢাকা অবস্থায় থাকলে ভিন্ন কথা।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৩১)
৩. শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “যখন তোমরা পান করো, তখন শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে।” এটি পানাহারের বরকত ও পবিত্রতা বৃদ্ধি করে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৮৮৫)
৪. ডান হাতে পান করা
সুন্নাত হলো সর্বদা ডান হাত ব্যবহার করা। মহানবী ﷺ বলেন:
“তোমরা বাম হাতে আহার কোরো না। কেননা শয়তান বাম হাতে আহার করে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩২৬৮)
৫. বসে পান করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে, হাঁটা বা শোয়া অবস্থায় পানি পান না করে বসে বসে পান করার নির্দেশ দিয়েছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতেও এটি নিরাপদ। আনাস (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে পানি পান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২০২৪)
৬. তিন শ্বাসে পান করা
একবারে গড়গড় করে সবটুকু পানি পান করা অনুচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা এক চুমুকে উটের মতো পানি পান কোরো না; বরং দুই-তিনবার (শ্বাস নিয়ে) পান কোরো।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৮৮৫)
৭. গ্লাসে নিঃশ্বাস না ফেলা
স্বাস্থ্যবিধি ও শিষ্টাচারের খাতিরে নবীজি ﷺ পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস ছাড়তে নিষেধ করেছেন। তিনি ﷺ বলেন:
“তোমরা (পান করার সময়) পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলো না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫৪)
৮. শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা
পানির নেয়ামত ভোগের পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন যে, পান করার শেষে যেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করা হয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৮৮৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই সুন্নাতগুলো মান্য করার মাধ্যমেই মুমিনের জীবন সুন্দর ও সার্থক হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই সুন্নাতগুলো অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়ার ভয়াবহতা
ইসলামী শরীয়তে একজন পবিত্র ও সতী নারীর সম্মান রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রমাণ ছাড়া কাউকে চরিত্রহীন বলা বা ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া একটি জঘন্য অপরাধ।
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এ সম্পর্কে সতর্ক করে ইরশাদ করেন:
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَرۡمُوۡنَ الۡمُحۡصَنٰتِ الۡغٰفِلٰتِ الۡمُؤۡمِنٰتِ لُعِنُوۡا فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ۪ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ﴿ۙ۲۳﴾
“যারা সতী-সাধ্বী, সরলমনা ঈমানদার নারীদের প্রতি (ব্যভিচারের) অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকাল ও পরকালে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]
অর্থাৎ, যারা অন্যের চরিত্রের ওপর কলঙ্ক লেপন করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
কযফ (قذف) বা অপবাদ প্রদানের সংজ্ঞা:
কোনো সতী-সাধ্বী ও পবিত্র নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়াকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘কযফ’ বলা হয়। এটি কবীরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং এর জন্য কঠোর পার্থিব শাস্তির বিধানও রয়েছে।
সালাফদের রমাদান ছিল কেবল রোজা আর ইফতারের মাস নয়—এটি কুরআনের সাথে নিবিড় মিলনের, আত্মাকে আলোকিত করার এবং প্রতিটি দিনকে তিলাওয়াতের মহোৎসবে পরিণত করার সময়।
আবুল বারাকাত হিবাতুল্লাহ ইবনু মাহফূজ (রহ.) রমাদান মাসে ত্রিশবার পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। প্রতিটি খতম ছিল নৈরাশ্য দূর করার এক আধ্যাত্মিক যাত্রা, প্রতিটি আয়াত হৃদয়ে নেমে আসা এক অনন্য আলো।
— ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ২১/২৬৬