দান
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা সম্পদ ব্যয়ের সঠিক পদ্ধতি ও দান কবুল হওয়ার শর্তসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। সূরা বাকারার আয়াতগুলোর আলোকে দানের মূল শিক্ষা ও শিষ্টাচার নিচে তুলে ধরা হলো:
দান-সদকার আদব ও মাহাত্ম্য
১. নিখাদ দানের পুরস্কার
اَلَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ثُمَّ لَا یُتۡبِعُوۡنَ مَاۤ اَنۡفَقُوۡا مَنًّا وَّ لَاۤ اَذًی ۙ لَّهُمۡ اَجۡرُهُمۡ عِنۡدَ رَبِّهِمۡ ۚ وَ لَا خَوۡفٌ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا هُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ﴿۲۶۲﴾
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করে এবং দান করার পর গ্রহীতাকে কোনো প্রকার খোঁটা দেয় না বা মানসিকভাবে কষ্ট দেয় না, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে মহৎ প্রতিদান। পরকালে তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা কোনো কারণে চিন্তিতও হবে না। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬২)
২. আচরণের গুরুত্ব
قَوۡلٌ مَّعۡرُوۡفٌ وَّ مَغۡفِرَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ صَدَقَۃٍ یَّتۡبَعُهَاۤ اَذًی ؕ وَ اللّٰهُ غَنِیٌّ حَلِیۡمٌ ﴿۲۶۳﴾
দান করে গ্রহীতাকে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে মিষ্টি ভাষায় কথা বলা এবং কারো ভুল ক্ষমা করে দেওয়া অনেক বেশি উত্তম। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কারো দানের মুখাপেক্ষী নন; তিনি পরম অভাবমুক্ত ও অত্যন্ত সহনশীল। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬৩)
৩. দান বাতিল হওয়ার কারণ
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَ الۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَهٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَ لَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِؕ فَمَثَلُهٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡهِ تُرَابٌ فَاَصَابَهٗ وَابِلٌ فَتَرَکَهٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲۶۴﴾
মুমিনদের সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, খোঁটা দিয়ে বা কষ্ট দিয়ে যেন তারা নিজেদের সদাকা বা দানকে নষ্ট না করে। যারা লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে না, তাদের দান সেই মসৃণ পাথরের মতো—যার ওপর সামান্য মাটির আস্তর থাকে, কিন্তু প্রবল বৃষ্টিতে তা ধুয়ে একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা যা অর্জন করেছে, তার মাধ্যমে পরকালে কোনো প্রতিদান পাওয়ার ক্ষমতা রাখবে না। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)
৪. প্রকাশ্য বনাম গোপন দান
اِنۡ تُبۡدُوا الصَّدَقٰتِ فَنِعِمَّا هِیَ ۚ وَ اِنۡ تُخۡفُوۡهَا وَ تُؤۡتُوۡهَا الۡفُقَرَآءَ فَهُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ وَ یُکَفِّرُ عَنۡکُمۡ مِّنۡ سَیِّاٰتِکُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ﴿۲۷۱﴾
দান প্রকাশ্যে করা যেমন ভালো, তেমনি অভাবীদের গোপনে দান করা আরও বেশি কল্যাণকর। এমন দান বান্দার গুনাহসমূহ মোচনের মাধ্যম হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, আমরা যা-ই করি না কেন, আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৭১)
আবূ ত্বালিবের মৃত্যুর ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা আবূ ত্বালিবের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং শিক্ষণীয়। হাদীস শরীফের আলোকে ঘটনাটি নিচে তুলে ধরা হলো:
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তাঁর পিতা মুসাইয়্যাব রাদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, আবূ ত্বালিব যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কাছে গেলেন। সেখানে আবূ জাহল এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াও উপস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাচাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
‘চাচাজান! আপনি কেবল একবার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালেমাটি পড়ুন, তাহলে আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারব।’
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আহ্বানের বিপরীতে আবূ জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া তাঁকে প্ররোচিত করে বলতে লাগল, ‘হে আবূ ত্বালিব! তুমি কি তোমার পিতা আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে?’ তারা বারবার একথার পুনরাবৃত্তি করতে থাকল। শেষ পর্যন্ত আবূ ত্বালিব তাদের প্ররোচনায় পড়ে বললেন, ‘আমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের (মিল্লাতের) উপরেই অটল আছি।’ এই কথা বলেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
আবূ সা’ঈদ খুদরী রাদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে তাঁর চাচার আলোচনা করা হলে তিনি বললেন:
‘আশা করি কিয়ামতের দিনে আমার সুপারিশ তাঁর উপকারে আসবে। তাঁকে আগুনের একটি হালকা স্তরে রাখা হবে, যা তাঁর পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছাবে এবং তাতেই তাঁর মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৮৮৫)
ইফতারের সুন্নাত পদ্ধতি ও শিষ্টাচার
রমজান মাসে রোজা পালনের পাশাপাশি ইফতারের সুন্নাত ও নিয়মগুলো মেনে চলা ইবাদতের পূর্ণতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ইফতারের ক্ষেত্রে সুন্নাত পদ্ধতি ও দিকনির্দেশনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দ্রুত ইফতার করা
ইফতারের সময় হওয়ার সাথে সাথে দেরি না করে ইফতার করা সুন্নাত। এ সময় সাংসারিক বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা সুন্নাত পরিপন্থী। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
‘মানুষ যতদিন পর্যন্ত (সময় হওয়ার পর) দ্রুত ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
২. আজানের সাথে সাথে ইফতার শুরু করা
মাগরিবের আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ইফতার করা উচিত। আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, কারণ শরিয়তে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য ইবাদতকে সহজ করতে চান। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠোরতা চান না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
৩. আজানের উত্তর দেওয়া
ইফতার করার সময় রোজাদারের জন্য আজানের উত্তর দেওয়া আবশ্যক নয়। তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মুয়াজ্জিন যা বলেন, তার উত্তর দেওয়া ফজিলতপূর্ণ কাজ।
৪. ইফতারে দীর্ঘ সময় ব্যয় না করা
ইফতারের জন্য অনেক বেশি সময় ব্যয় করা এবং এর ফলে জামাআতের সাথে নামাজ আদায়ে দেরি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ইবনে আতিয়্যা রাদ্বিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন:
‘রাসূলুল্লাহ ﷺ সামান্য ইফতার গ্রহণ করে দ্রুত নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন।’
৫. ইফতারের সময় দোয়া করা
ইফতারের মুহূর্তটি দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় গল্প-গুজব বা অতিরিক্ত কাজে ব্যস্ত না থেকে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—পিতামাতার দোয়া, রোজাদারের দোয়া এবং মুসাফিরের দোয়া।’ (মুসনাদে আহমাদ)
৬. অপচয় বর্জন করা
ইফতার হোক বা অন্য খাবার, অপচয় করা সুন্নাতের পরিপন্থী। সংযমের মাসে ইফতার নিয়ে জৌলুস বা লোক দেখানো বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
হারাম উপার্জন ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ ভক্ষণের ভয়াবহতা
ইসলামি জীবনদর্শনে হালাল উপার্জনকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং যে কোনো উপায়ে হারাম ভক্ষণ করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর পরিণাম নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অন্যের সম্পদ আত্মসাতের নিষেধাজ্ঞা
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন:
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَ لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ
“তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৮]
অর্থাৎ চুরি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ বা প্রবঞ্চনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ভোগ করা সম্পূর্ণ হারাম।
২. ইবাদত ও দোয়া কবুলের প্রতিবন্ধকতা
হারাম ভক্ষণ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে বলেছেন:
«الرجل يطيل السفر أشعث أغبر يمد يده إلى السماء يا رب يا رب ومطعمه حرام ومشربه حرام وملبسه حرام وغذي بالحرام فأنى يستجاب لذلك».
“কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করলো, বিক্ষিপ্ত চুল, ধূলা-বালিযুক্ত শরীর, দুই হাত আসমানের দিকে উঠিয়ে দো’আ করতে থাকে আর বলতে থাকে: হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম দ্বারা শক্তি সঞ্চয় করা হয়েছে। তাহলে কীভাবে তার দো’আ কবুল করা হবে?” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৬৮৬]
এই হাদীসটি স্পষ্ট করে যে, শরীরের রক্ত ও মাংস যদি হারাম খাবারে গড়ে ওঠে, তবে সেই ব্যক্তির বিনীত প্রার্থনাও আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না।
রমাদান সালাফদের কাছে কেবল রোজার মাস ছিল না—এটি ছিল দয়া, পরোপকার এবং আত্মত্যাগের মাস। প্রতিটি ইফতার যেন এক পরীক্ষার মুহূর্ত, প্রতিটি রাত ছিল নেক আমলের সুযোগ, যেখানে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা কেবল আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হয়ে উঠত।
হযরত ইবনু উমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) মিসকিনদের সঙ্গে না খেয়ে কখনও ইফতার করতেন না। ভিক্ষুক এলে তিনি নিজ অংশের খাবার দিতেন, আর নিজে রাত কাটাতেন না খেয়ে—এটি এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত, যা সত্যিকার রোজার মর্যাদা এবং পরোপকারের মহিমা প্রদর্শন করে।
— ইবনু রজব হাম্বলী, লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃ. ৩১৪