তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ)
মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের শাশ্বত ঘোষণা:
قُلۡ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾ اَللّٰهُ الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾ لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ وَ لَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ﴿۳﴾ وَ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ کُفُوًا اَحَدٌ ﴿۴﴾
(হে হাবিব) বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, বরং সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। আর তাঁর সমতুল্য দ্বিতীয় কেউ নেই। [সুরা ইখলাস]
وَ اِلٰـهُکُمۡ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الرَّحۡمٰنُ الرَّحِیۡمُ ﴿۱۶۳﴾
তোমাদের উপাস্য কেবল একজনই। সেই পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৩]
اَللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُهٗ سِنَۃٌ وَّ لَا نَوۡمٌ ؕ لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَهٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِهٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مَا خَلۡفَهُمۡ ۚ وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِهٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ کُرۡسِیُّهُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ ۚ وَ لَا یَـُٔوۡدُهٗ حِفۡظُهُمَا ۚ وَ هُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ ﴿۲۵۵﴾
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব এবং মহাবিশ্বের সবকিছুর ধারক। ক্লান্তি বা ঘুম তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিক তিনি। তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করার সাধ্য কারো নেই। সৃষ্টির সামনে বা পেছনে যা কিছু আছে—তার সবই তিনি জানেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে কোনো কিছু আয়ত্ত করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর সিংহাসন (কুরসি) সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে; আর এই বিশাল সৃষ্টিজগতকে রক্ষা করা তাঁর জন্য মোটেও কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং মহান। [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫]
شَهِدَ اللّٰهُ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۙ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃُ وَ اُولُوا الۡعِلۡمِ قَآئِمًۢا بِالۡقِسۡطِ ؕ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿ؕ۱۸﴾
আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরম পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। [সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৮]
মুমিনের কারামত
বহু বছর আগের কথা। বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি তার এক পরিচিত লোকের কাছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ঋণ চাইলেন। ঋণদাতা বললেন, “আমি তোমাকে ধার দিতে পারি, কিন্তু সাক্ষী হিসেবে কাকে রাখবে?”
ঋণগ্রহীতা দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে উত্তর দিলেন, “সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।”
ঋণদাতা আবার বললেন, “তাহলে তোমার পক্ষে জামিনদার (গ্যারান্টার) কে হবে?”
ব্যক্তিটি একই ভঙ্গিতে বললেন, “জামিনদার হিসেবেও আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট।”
তাঁর এমন গভীর ঈমান দেখে ঋণদাতা মুগ্ধ হলেন এবং কোনো সাক্ষী বা জামিনদার ছাড়াই তাকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার দিলেন। ঠিক হলো, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
ঋণগ্রহীতা সেই টাকা নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সুদূর এক শহরে গেলেন। সেখানে ব্যবসা শেষ করে যখন ফেরার সময় হলো, তখন তিনি পড়লেন মহাবিপদে। ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট দিনটি ঘনিয়ে এলেও তিনি বাড়ি ফেরার জন্য কোনো জাহাজ খুঁজে পেলেন না। একের পর এক বন্দর ঘুরলেন, কিন্তু কোনো নৌযানই সেই গন্তব্যে যাচ্ছিল না।
এদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে। পাওনাদারের কাছে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করতে না পারার চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। অবশেষে তিনি এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি এক টুকরো মোটা কাঠ সংগ্রহ করে তা খোদাই করে ভেতরটা ফাঁপা করলেন। তারপর তার ভেতর ঋণের এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং একটি চিঠি ভরে মুখটি ভালোভাবে বন্ধ করে দিলেন।
সেটি নিয়ে তিনি সমুদ্রের তটে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করলেন, “হে আল্লাহ! তুমি জানো আমি যখন ঋণ নিয়েছিলাম, তখন তুমিই ছিলে আমার সাক্ষী ও জামিনদার। আমি যথাসময়ে টাকা পৌঁছে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো জাহাজ পাইনি। তাই আজ তোমার কাছেই এই আমানত সঁপে দিলাম।” এই বলে তিনি কাঠের টুকরোটি সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিলেন। নিজের চোখের সামনে কাঠটিকে দিগন্তে মিলিয়ে যেতে দেখে তিনি ভারমুক্ত মনে বাড়ি ফিরে গেলেন।
অন্যদিকে, নির্ধারিত দিনে সেই ঋণদাতা সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে জাহাজের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু কোনো জাহাজ এল না। হতাশ হয়ে যখন তিনি ফিরতে চাইলেন, তখন দেখলেন তীরের বালিতে একটি কাঠের টুকরো পড়ে আছে। ভাবলেন, “যাক, অন্তত জ্বালানি হিসেবে বাড়িতে কাজে লাগবে।”
বাড়িতে নিয়ে কাঠটি চেরার সময় তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, ভেতর থেকে ঝকঝকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে আসছে! সাথে সেই চিঠিটি। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।
কিছুদিন পর, প্রথম ব্যক্তিটি অন্য একটি জাহাজ পেয়ে আরও এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে পাওনাদারের কাছে হাজির হলেন। তিনি লজ্জিত হয়ে বললেন, “ভাই, আমি অনেক চেষ্টা করেও সঠিক সময়ে জাহাজ না পাওয়ায় সময়মতো আসতে পারিনি। এই নিন আপনার পাওনা।”
ঋণদাতা হেসে বললেন, “ভাই, তোমাকে আর টাকা দিতে হবে না। তুমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে কাঠের যে টুকরোটি ভাসিয়ে দিয়েছিলে, আল্লাহ সেটি আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তোমার ঋণ পরিশোধ হয়ে গেছে।”
[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২২৯১]
গল্প থেকে শিক্ষা:
আল্লাহর ওপর ভরসা: যার কেউ নেই, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
সততা ও সদিচ্ছা: ঋণ পরিশোধের জন্য কেউ যদি মনেপ্রাণে চেষ্টা করে, তবে আল্লাহ অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেন।
ওয়াদা রক্ষা: মুমিন নিজের ওয়াদা রক্ষায় সবসময় ব্যাকুল থাকে।
ওযুর সুন্নাতসমূহ
১. বিসমিল্লাহ বলে ওযু শুরু করা।
২. শুরুতে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা।
৩. কুলি করা এবং নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা।
৪. বাম হাত দিয়ে নাক ঝেড়ে পানি বের করা।
৫. গড়গড়া করার মাধ্যমে মুখে এবং নাকের উপরিভাগের গভীরে পানি পৌঁছানো।
৬. একই হাতের পানি দিয়ে কুলি করা ও নাকে পানি প্রবেশ করানো।
৭. মিসওয়াক করা।
৮. মুখ ধোয়ার সময় আঙুল দিয়ে ঘন দাড়ি খিলাল করা।
৯. মাথা মাসেহ করা।
১০. হাত ও পায়ের আঙুলের ফাঁকগুলোতে পানি পৌঁছানো (খিলাল করা)।
১১. ডান হাত ও ডান পা থেকে ধোয়া শুরু করা।
১২. ওযুর অঙ্গগুলো (চেহারা, হাত ও পা) এক থেকে তিনবার পর্যন্ত ধৌত করা।
১৩. ওযু শেষে কালিমা শাহাদাত পাঠ করা। এর ফজিলত হলো, ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয় এবং সে যে কোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারে।
১৪. সম্ভব হলে নিজের বাড়িতেই ওযু করা।
১৫. ওযুর অঙ্গগুলো হাত দিয়ে ঘষে ধোয়া।
১৬. পরিমিত পানি ব্যবহার করা (হিসাব করে পানি ব্যয় করা)।
১৭. হাত ও পায়ের ফরজ অংশ ধোয়ার সময় সীমানার কিছুটা অতিরিক্ত অংশ ধৌত করা।
১৮. ওযু শেষ করে দুই রাকাআত সালাত (তাহিইয়াতুল ওযু) আদায় করা।
ফজিলত:
রসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি যথাযথভাবে ওযু করে মনোযোগের সাথে দুই রাকাআত সালাত আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। এমনকি তার শরীর ও নখের নিচ থেকেও পাপ ঝরে পড়বে।
‘মানুষ হত্যা করা’
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱلَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُواْ لَمۡ يُسۡرِفُواْ وَلَمۡ يَقۡتُرُواْ وَكَانَ بَيۡنَ ذَٰلِكَ قَوَامٗا ٦٧ وَٱلَّذِينَ لَا يَدۡعُونَ مَعَ ٱللَّهِ إِلَٰهًا ءَاخَرَ وَلَا يَقۡتُلُونَ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّ وَلَا يَزۡنُونَۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ يَلۡقَ أَثَامٗا ٦٨ يُضَٰعَفۡ لَهُ ٱلۡعَذَابُ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَيَخۡلُدۡ فِيهِۦ مُهَانًا ٦٩ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلٗا صَٰلِحٗا ٧٠﴾ [الفرقان: ٦٦، ٦٩
“আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন শরয়ি কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা এসব করবে তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল থাকবে। তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎ কাজ করে, তারা এই শাস্তির অন্তর্ভুক্ত নয়।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৭-৭০]
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন এবং হত্যাকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং, শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া মানুষ হত্যা করা একটি জঘন্য কবিরা গুনাহ।
রমাদান সালাফদের কাছে ছিল না কেবল রোজা ও ইফতারের মাস; ছিল কুরআনের সাথে অন্তরের পুনর্মিলনের এক মহাসময়। দিন গড়াত তিলাওয়াতের সুরে, রাত ভিজত অশ্রু ও মনোযোগে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)—যিনি কুরআনের তিলাওয়াতে গভীরতা ও খুশূর জন্য প্রসিদ্ধ—রমাদান শরিফে প্রতি তিন দিনে একবার পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। আর রমাদান ছাড়া অন্য সময়ে প্রতি সপ্তাহে এক খতম সম্পন্ন করতেন।
— আস-সুনানুল কুবরা, বায়হাকি, ২/৫৫৫