হিংসা
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের অন্তরের ব্যাধি ‘হিংসা’ এবং শয়তানের প্ররোচনা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। আয়াতগুলোর আলোকে এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর হিংসা করার নিন্দা
আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহ দান করেন। কিন্তু অনেক মানুষ এই অনুগ্রহ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
اَمۡ یَحۡسُدُوۡنَ النَّاسَ عَلٰی مَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ ۚ فَقَدۡ اٰتَیۡنَاۤ اٰلَ اِبۡرٰهِیۡمَ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ اٰتَیۡنٰهُمۡ مُّلۡکًا عَظِیۡمًا ﴿۵۴﴾
“বরং তারা কি লোকদেরকে হিংসা করে, আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তার কারণে? তাহলে তো আমি ইবরাহীমের বংশধরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি বিশাল রাজত্ব।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৫৪]
২. বিদ্বেষের কারণে সত্য বিমুখতা
মানুষের মধ্যে সত্যের জ্ঞান আসার পরেও অনেক সময় তারা কেবল পারস্পরিক বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে বিভেদ সৃষ্টি করে। ইরশাদ হয়েছে:
انَ النَّاسُ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً ۟ فَبَعَثَ اللّٰهُ النَّبِیّٖنَ مُبَشِّرِیۡنَ وَ مُنۡذِرِیۡنَ ۪ وَ اَنۡزَلَ مَعَهُمُ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ لِیَحۡکُمَ بَیۡنَ النَّاسِ فِیۡمَا اخۡتَلَفُوۡا فِیۡهِ ؕ وَ مَا اخۡتَلَفَ فِیۡهِ اِلَّا الَّذِیۡنَ اُوۡتُوۡهُ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡهُمُ الۡبَیِّنٰتُ بَغۡیًۢا بَیۡنَهُمۡ ۚ فَهَدَی اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لِمَا اخۡتَلَفُوۡا فِیۡهِ مِنَ الۡحَقِّ بِاِذۡنِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ یَهۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ﴿۲۱۳﴾
মানুষ ছিল এক উম্মত। অতঃপর আল্লাহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে নবীদেরকে প্রেরণ করলেন এবং সত্যসহ তাদের সাথে কিতাব নাযিল করলেন, যাতে মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করত। আর তারাই তাতে মতবিরোধ করেছিল, যাদেরকে তা দেয়া হয়েছিল, তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরও পরস্পরের মধ্যে বিদ্বেষবশত। অতঃপর আল্লাহ নিজ অনুমতিতে মুমিনদেরকে হিদায়াত দিলেন যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছিল। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন। (সুরা বাকারা-২১৩)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মু’জিযা
ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান ও ত্যাগের উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু। তাঁর জীবনের এক অবিস্মরণীয় ও ঈমান উদ্দীপক ঘটনা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন—
সেটি ছিল আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু-এর জন্য ধৈর্যের এক চরম পরীক্ষা। ক্ষুধার তীব্রতায় তিনি কখনও মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতেন, আবার কখনও পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন। একদিন সাহাবীগণের যাতায়াতের পথে তিনি এই আশায় বসে পড়লেন যে, কেউ হয়তো তাঁর অবস্থা বুঝতে পারবেন। প্রথমে আবু বকর রাদ্বিআল্লাহু আনহু আসলেন, তাঁকে তিনি কুরআনের একটি আয়াত জিজ্ঞেস করলেন। আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশ্য ছিল—তিনি যেন ক্ষুধার্ত বুঝতে পেরে কিছু খেতে দেন। কিন্তু আবু বকর রাদ্বিআল্লাহু আনহু উত্তর দিয়ে চলে গেলেন। এরপর ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু আসলেন, তাঁকেও একই উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, কিন্তু তিনিও কিছু না দিয়ে চলে গেলেন।
অবশেষে আবুল কাসেম, আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু-কে দেখেই তিনি মুচকি হাসলেন। তিনি তাঁর চেহারা দেখেই মনের না বলা সকল কথা ও কষ্ট বুঝে ফেললেন। দরদী কণ্ঠে ডাকলেন, “হে আবু হুরায়রা!”
আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু সাড়া দিয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত।” নবীজি ﷺ বললেন, “আমার সঙ্গে চলো।”
নবীজি ﷺ বাড়িতে প্রবেশ করে একটি পেয়ালায় কিছু দুধ দেখতে পেলেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন কোনো এক আনসারী সাহাবী তাঁকে এটি হাদিয়া (উপঢৌকন) দিয়েছেন। এরপর তিনি আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু-কে বললেন, “আহলে সুফ্ফার লোকদের ডেকে আনো।”
আহলে সুফ্ফা ছিলেন ইসলামের মেহমান, যাদের পরিবার বা সম্পদ কিছুই ছিল না। আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু মনে মনে কিছুটা চিন্তিত হলেন। তিনি ভাবলেন—এতটুকু দুধ দিয়ে অত মানুষের কী হবে? আমিই তো এই দুধ পানের বেশি হকদার ছিলাম, যাতে আমার শরীরে শক্তি ফিরে আসত। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের সামনে কোনো দ্বিধা রইল না। তিনি সবাইকে ডেকে আনলেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু নিজে পরিবেশনকারী হলেন। তিনি একেকজনের হাতে পেয়ালা তুলে দিতে লাগলেন। এক ব্যক্তি পেট ভরে পান করে তৃপ্ত হয়ে পেয়ালা ফেরত দিলেন। এরপর অন্যজন, এরপর অন্যজন—এভাবে আহলে সুফ্ফার প্রায় ৭০ জন সদস্যের সবাই তৃপ্তিভরে পান করলেন।
সবশেষে নবীজি ﷺ পেয়ালা হাতে নিয়ে আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু-এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “আবু হুরায়রা! এখন শুধু আমি আর তুমিই বাকি।” তিনি তাঁকে বসে পান করতে বললেন। আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু পান করলেন। নবীজি ﷺ বারবার বলতে থাকলেন, “আরও পান করো।” এভাবে কয়েকবার পান করার পর আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু আরজ করলেন, “আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আমার পেটে আর তিল পরিমাণ জায়গা নেই।”
অবশেষে নবীজি ﷺ সেই পেয়ালা নিলেন, আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং ‘বিসমিল্লাহ’ বলে অবশিষ্ট দুধ পান করলেন।
[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬৪৫২]
গোসলের সুন্নাত তরিকা
রাসূলুল্লাহ ﷺ যে পদ্ধতিতে ফরয গোসল সম্পাদন করতেন, হাদীস ও সুন্নাহর আলোকে তার ধারাবাহিক বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নিয়ত ও বিসমিল্লাহ
* নিয়ত করা: প্রথমেই মনে মনে এই সংকল্প করা যে, বড় নাপাকি থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এই গোসল করা হচ্ছে।
* বিসমিল্লাহ বলা: গোসলের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কাজ আরম্ভ করা।
২. হাত ও লজ্জাস্থান পরিষ্কার করা
* হাত ধৌত করা: শুরুতে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া।
* লজ্জাস্থান পরিষ্কার করা: এরপর বাম হাত দিয়ে লজ্জাস্থান এবং এর আশপাশের নাপাকি বা ময়লা ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা।
* হাত পুনরায় পরিষ্কার করা: লজ্জাস্থান ধোয়ার পর বাম হাতটি সাবান দিয়ে অথবা মাটি বা দেওয়ালে ঘষে (তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী) উত্তমরূপে পরিষ্কার করে নেওয়া।
৩. ওযূ ও মাথা ধৌত করা
* ওযূ করা: নামাজের ওযূর মতো করে পূর্ণাঙ্গভাবে ওযূ সম্পন্ন করা।
* মাথা ভেজানো: ওযূর পর মাথায় তিনবার পানি ঢেলে চুলের গোড়া পর্যন্ত ভালোভাবে ভিজিয়ে নেওয়া। প্রথমে মাথার ডান দিকে, তারপর বাম দিকে এবং শেষে মাঝখানে পানি ঢালা।
* পুরুষদের জন্য: দাড়ি ও মাথার প্রতিটি চুল গোড়াসহ ভালোভাবে ভেজানো জরুরি।
* মহিলাদের জন্য: শুধু চুলের গোড়া ভেজালেই যথেষ্ট; খোঁপা বা বেণি খোলা জরুরি নয়।
৪. সর্বাঙ্গ ধৌত করা
* শরীরের পানি ঢালা: এরপর সারা শরীরে পানি ঢেলে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রেও প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে পানি ঢালা সুন্নাত।
* মাজাঘষা করা: শরীরের যেসব স্থানে সহজে পানি পৌঁছায় না, সেখানে হাত দিয়ে মাজাঘষা করে পানি পৌঁছে দেওয়া।
৫. স্থান পরিবর্তন ও পা ধোয়া
* পা ধৌত করা: সবশেষে গোসলের জায়গা থেকে সামান্য সরে গিয়ে উভয় পা ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া। উল্লেখ্য যে, গোসলের এই পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতির পর পুনরায় ওযূ করার প্রয়োজন নেই, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ গোসলের পর আর ওযূ করতেন না।
পেশাবের অপবিত্রতা ও কবরের আযাব
পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। দৈনন্দিন জীবনে পেশাব-পায়খানা থেকে যথাযথভাবে পবিত্র না হওয়াকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে এবং এর অবহেলাকে কবরের আযাবের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
«مر النبي صلى الله عليه وسلم بقبرين فقال إنهما ليعذبان وما يعذبان في كبير أما أحدهما فكان لايسةةر من البول وأما الآخر فكان يمشي النميمة».
নবী করীম ﷺ দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি কবরের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে সাহাবীদের সতর্ক করে বলেন: “এই দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে খুব কঠিন কোনো বিষয়ের জন্য তাদের এই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না (অর্থাৎ যা থেকে বেঁচে থাকা তাদের জন্য খুব সহজ ছিল)। তাদের মধ্যে একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না, আর অন্যজন চোগলখোরি করে (একজনের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে) বেড়াত।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৬১১]
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে এবং তাঁর মাধ্যমে পুরো উম্মতকে পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
وَ ثِیَابَکَ فَطَهِّرۡ ۪﴿ۙ۴﴾
“এবং তোমার কাপড়কে তুমি পবিত্র করা।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত : ৪]
সালাত বা ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য শরীর ও পোশাক পবিত্র থাকা পূর্বশর্ত। পেশাবের ছিটেফোঁটা থেকে বেঁচে থাকা এবং অসাবধানতাবশত শরীরে বা কাপড়ে নাপাকি লেগে গেলে তা সাথে সাথে ধুয়ে পবিত্র করে নেওয়া মুমিনের একান্ত কর্তব্য। পেশাবের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে না থাকা কেবল শারীরিক অপরিচ্ছন্নতা নয়, বরং পরকালীন কঠিন শাস্তিরও কারণ।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই বিপদ থেকে তাঁর দয়া ও রহমতের মাধ্যমে রক্ষা করুন। আমীন।
রমাদান মূলত আত্মার মুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাস—যেখানে শুধু ক্ষুধা বা তৃষ্ণা নয়, বরং শৃঙ্খলা ও ধৈর্যই মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাছাকাছি নিয়ে যায়।
হযরত ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেছেন—
“যদি রমাদানে তুমি রাতের নামাজ (তারাবিহ / কিয়ামুল লাইল) আদায় করতে না পারো এবং দিনের রোজা রাখতে না পারো, তবে জেনে রেখো—তুমি বঞ্চিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ; তোমার পাপই তোমাকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে।”
— ডক্টর কামিল সুবহি সালাহ, হালুস সালাফি ফী শাহরি রমাদানাল মুবারাক, পৃ. ১৫, alukah.net