রাগ
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং বিপক্ষ শক্তির অন্তরের অবস্থা বর্ণনায় ‘রাগ’ বা ‘ক্রোধ’ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের অধিকারী মুত্তাকী বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ الۡکٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَ الۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ﴿۱۳۴﴾ۚ
যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সে সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। (সুরা আলে ইমরান-১৩৪)
মুনাফিক ও ইসলামের শত্রুরা মুমিনদের সামনে একরকম ভান করে, কিন্তু আড়ালে তারা প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হিংসা পোষণ করে। তাদের এই তীব্র রাগের চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ বলেন:
وَ اِذَا لَقُوۡکُمۡ قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚ٭ۖ وَ اِذَا خَلَوۡا عَضُّوۡا عَلَیۡکُمُ الۡاَنَامِلَ مِنَ الۡغَیۡظِ ؕ قُلۡ مُوۡتُوۡا بِغَیۡظِکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۱۱۹﴾
আর যখন তারা তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’। আর যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তোমাদের উপর রাগে আঙ্গুল কামড়ায়। বল, ‘তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মর’! নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৯]
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। অন্যদিকে, মুমিনদের উচিত শত্রুর অন্তরের গোপন রাগ বা বিদ্বেষ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
সুমামার প্রতি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর উত্তম আচরণের অনুপম নিদর্শন
আরবের তপ্ত মরুপ্রান্তরে তখন ইসলামের জয়গান বাজছে। একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে একদল অশ্বারোহী সৈন্য ইয়ামামার প্রতাপশালী নেতা ও বনী হানীফা গোত্রের সরদার সুমামাহ ইবন উছালকে বন্দী করে নিয়ে আসলেন। তাঁকে মদিনায় এনে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হলো।
রহমতের নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কাছে এসে অত্যন্ত শান্ত ও কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “হে সুমামাহ! তোমার মনের খবর কী? তুমি কী মনে করছ?”
সুমামাহ ছিলেন আরবের এক গর্বিত সরদার। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জবাব দিলেন— “হে মুহাম্মাদ! আমার ধারণা ভালোই। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন রক্তপিপাসু খুনীকেই হত্যা করবেন। আর যদি আমার ওপর অনুগ্রহ করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি মুক্তিপণ হিসেবে অর্থ চান, তবে যা খুশি চাইতে পারেন, আমি তা দিয়ে দেব।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ওপর কোনো জোর করলেন না, কেবল মুচকি হেসে সেদিনের মতো তাঁকে তাঁর অবস্থায় রেখে চলে গেলেন।
পরপর তিন দিন একই ঘটনা ঘটল। প্রতিদিন নবীজি ﷺ এসে কুশল বিনিময় করতেন এবং সুমামাহ একই আভিজাত্যমাখা উত্তর দিতেন। এই তিন দিন খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় সুমামাহ খুব কাছ থেকে দেখলেন মুসলমানদের নামাজ, তাঁদের ভ্রাতৃত্ব এবং নবীজির অতুলনীয় চরিত্র। তাঁর অন্তরের ঘৃণার বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল। তৃতীয় দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন— “যাও, তোমরা সুমামাহকে ছেড়ে দাও!”
মুক্ত হয়ে সুমামাহ পালিয়ে যাননি, বরং ইসলামের প্রতি তাঁর এক নতুন কৌতূহল সৃষ্টি হলো। তিনি মসজিদের নিকটস্থ একটি খেজুর বাগানে গিয়ে পরম তৃপ্তিতে গোসল করলেন। এরপর পবিত্র হয়ে পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং উচ্চকণ্ঠে পাঠ করলেন:
“আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।”
কালিমা পাঠের পর তিনি আবেগপ্লুত কণ্ঠে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন— “হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম, কিছুক্ষণ আগেও এই পৃথিবীতে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারো চেহারা আমার কাছে বেশি ঘৃণ্য ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার চোখে সবচেয়ে সুন্দর ও প্রিয়। আপনার দ্বীনের চেয়ে অপ্রিয় কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিল না, আজ আপনার দ্বীনই আমার সবচেয়ে প্রিয়। আপনার শহরের প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল, আজ আপনার এই মদিনাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় শহর।”
সুমামাহ আসলে ওমরাহ করার উদ্দেশ্যেই বের হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ইসলামের সুসংবাদ দিলেন এবং ওমরাহ পালনের অনুমতি দিলেন। তিনি যখন মক্কায় পৌঁছলেন, তখন মক্কার কুরাইশরা তাঁকে উপহাস করে বলল, “তুমি কি পৈত্রিক ধর্ম ছেড়ে বেদ্বীন হয়ে গেলে?”
সুমামাহ রাদ্বিআল্লাহু আনহু বুক চিতিয়ে জবাব দিলেন, “কখনোই না! বরং আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর জেনে রেখো, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুমতি ছাড়া ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও তোমাদের মক্কায় পৌঁছাবে না!”
এভাবেই সুমামাহ ইবন উছাল রাদ্বিআল্লাহু আনহু কেবল একজন মুসলিমই হলেন না, বরং মক্কার অর্থনৈতিক অবরোধকারী হয়ে ইসলামের এক দুর্ভেদ্য ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হলেন।
(বুখারী হাদিস: ৪৬২, মুসলিম হাদিস: ১৭৬৪, মিশকাত হাদিস: ৩৯৬৪, ‘জিহাদ’ অধ্যায়, ‘যুদ্ধবন্দীদের বিধান’ অনুচ্ছেদ)।
হাত ও পায়ের নখ কাটার সুন্নাত পদ্ধতি
ইসলামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। বিশেষ করে জুমার দিন নখ কাটা ও পরিচ্ছন্ন হওয়া সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। যদি আমরা সুন্নাত তরিকায় নখ কাটি, তবে এই পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমেও সাওয়াব লাভ করা সম্ভব।
নখ কাটার সময় ও ফজিলত
* সাপ্তাহিক আমল: সপ্তাহে অন্তত একবার হাত ও পায়ের নখ কাটা সুন্নাত।
* জুমার দিনের গুরুত্ব: শুক্রবার জুমার নামাজে যাওয়ার আগে নখ কাটা উত্তম ও সুন্নাত।
(সূত্র: শরহুস্ সুন্নাহ, হাদিস নং ৩০৯০ ও ৩০৯১)
হাতের নখ কাটার সুন্নাত পদ্ধতি
হাতের নখ কাটার ক্ষেত্রে দুই হাতকে মোনাজাতের আকৃতিতে কাছাকাছি রাখতে হয়। এরপর নিচের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা সুন্নাত:
১. প্রথমে ডান হাতের শাহাদাত আঙ্গুল (তর্জনী) থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে কনিষ্ঠ আঙ্গুল পর্যন্ত কাটা।
২. এরপর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি পর্যন্ত কেটে শেষ করা।
৩. সবার শেষে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ কাটা।
(সূত্র: ফাতওয়ায়ে শামী ও ফাতওয়ায়ে আলমগীরী)
পায়ের নখ কাটার সুন্নাত পদ্ধতি
পায়ের নখ কাটার ক্ষেত্রে ডান দিক থেকে শুরু করে বাম দিকে শেষ করা সুন্নাত:
* ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুল থেকে নখ কাটা শুরু করতে হবে এবং ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি পর্যন্ত কাটতে হবে।
* এরপর বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে বাম পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুল পর্যন্ত নখ কেটে শেষ করতে হবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার এই সুন্নাতটি আমাদের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আত্মিক প্রশান্তি ও সাওয়াব অর্জনে সহায়তা করে।
দুনিয়া অর্জনের লক্ষ্যে ইলম শিক্ষা ও সত্য গোপন করার পরিণাম
দ্বীনি জ্ঞান বা ইলম অর্জন করা ইবাদত, কিন্তু তা যদি অসৎ উদ্দেশ্যে হয় তবে তা ভয়াবহ শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ সংক্রান্ত সর্তকবাণী নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সত্য গোপনকারীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ
আল্লাহ তাআলা মানুষের হিদায়াতের জন্য যে স্পষ্ট নিদর্শন ও পথনির্দেশনা অবতীর্ণ করেছেন, তা জেনেও যারা দুনিয়াবি স্বার্থে গোপন করে, তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلۡنَا مِنَ الۡبَیِّنٰتِ وَ الۡهُدٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا بَیَّنّٰهُ لِلنَّاسِ فِی الۡکِتٰبِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَلۡعَنُهُمُ اللّٰهُ وَ یَلۡعَنُهُمُ اللّٰعِنُوۡنَ ﴿۱۵۹﴾ۙ اِلَّا الَّذِیۡنَ تَابُوۡا وَ اَصۡلَحُوۡا وَ بَیَّنُوۡا فَاُولٰٓئِکَ اَتُوۡبُ عَلَیۡهِمۡ ۚ وَ اَنَا التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ﴿۱۶۰﴾
“আমি যে সব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পরও যারা তা গোপন রাখে, আল্লাহ তাদের অভিসম্পাত দেন এবং অভিশাপকারীরাও তাদের অভিশাপ দেয়। কিন্তু যারা তাওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে আর সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, তাদেরই প্রতি আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৫৯-১৬০]
২. লোকদেখানো ও অহমিকার জন্য ইলম অর্জন
ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। যারা অন্য উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জন করে তাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«من تعلم العلم ليباهي به العلماء أو يماري به السفها و أو جهنم” يصرف به وجوه الناس إليه أدخله الله جهنم».
“যে ব্যক্তি জ্ঞানীদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করার লক্ষ্যে অথবা মূর্খের সাথে বিতর্কের উদ্দেশ্যে অথবা মানুষের দৃষ্টি তার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।” [ইবন মাজাহ, হাদীস নং: ২৫৬]
৩. পার্থিব স্বার্থে দ্বীনি জ্ঞান ব্যবহারের শাস্তি
দ্বীনি জ্ঞানকে যারা স্রেফ অর্থ-সম্পদ উপার্জনের মাধ্যম বানায়, তাদের জান্নাতে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন:
«من تعلم علما مما يبتغي به وجه الله لا ية علمه الا ليصيب به عرضا من الدنيا لم يجد عرف الجنة يوم القيامة».
“যে ব্যক্তি দীনি ইলম শিক্ষা করল ধন সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে (অথচ তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হওয়া উচিত ছিল), সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।” [আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩১৭৯]
পরিশেষে, সত্যকে গোপন করা এবং দ্বীনকে দুনিয়া কামাইয়ের হাতিয়ার বানানো ঈমানের পরিপন্থী কাজ। আল্লাহ আমাদের সঠিক উদ্দেশ্যে ইলম অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
রমাদানকে সালাফরা শুধুমাত্র রোজা রাখার মাস হিসেবে দেখতেন না—এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং গভীর ইবাদতের মাস। প্রতিটি রাতের নামাজ, প্রতিটি দিনের রোজা তাদের জন্য আত্মার পরীক্ষা এবং নেক আমলের এক অনন্য সুযোগ।
হযরত হাসান আল-বসরী (রহ.) বলেছেন—
“যদি তুমি রমাদানে রাতের নামাজ পড়তে না পারো এবং দিনের রোজা রাখতে না পারো, তবে জেনে রাখো—তুমি বঞ্চিত; পাপ ও গুনাহ তোমাকে আবদ্ধ করে ফেলেছে। আমি ইবাদতের মধ্যে রাতের গভীরে আদায় করা নামাজের চেয়ে অধিক কঠিন কোনো ইবাদত খুঁজে পাইনি।”
— ডক্টর কামিল সুবহি সালাহ, হালুস সালাফি ফী শাহরি রমাদানাল মুবারাক, পৃ. ১৫, alukah.net