অহঙ্কার
অহঙ্কার মানুষের আমল ধ্বংসকারী এক মারাত্মক ব্যাধি। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ তা‘আলা অহঙ্কারীদের পরিণাম এবং তাদের প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।
১. অহঙ্কার সত্য বিমুখতার কারণ
যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, অহঙ্কার তাদের অন্তরকে সত্য গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
اِلٰـهُکُمۡ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ ۚ فَالَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ مُّنۡکِرَۃٌ وَّ هُمۡ مُّسۡتَکۡبِرُوۡنَ ﴿۲۲﴾
“তোমাদের ইলাহ একক ইলাহ। অনন্তর যারা পরজীবনে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্যবিমুখ এবং তারা অহঙ্কার প্রদর্শন করেছে।” [সূরা নাহল, আয়াত: ২২]
২. আল্লাহর অপছন্দনীয় গুণ
অহঙ্কার এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা মানুষকে আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে। গোপন বা প্রকাশ্য—সবই আল্লাহর নখদর্পণে। ইরশাদ হয়েছে:
لَاجَرَمَ اَنَّ اللّٰهَ یَعۡلَمُ مَا یُسِرُّوۡنَ وَ مَا یُعۡلِنُوۡنَ ؕ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡتَکۡبِرِیۡنَ ﴿۲۳﴾
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের গোপন ও প্রকাশ্য যাবতীয় বিষয়ে অবগত। নিশ্চয়ই তিনি অহঙ্কারীদের পছন্দ করেন না।” [সূরা নাহল, আয়াত: ২৩]
৩. চলাফেরা ও আচরণে বিনয়
অন্যের প্রতি তুচ্ছজ্ঞান করা এবং জমিনে দম্ভভরে চলাফেরা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। হযরত লুকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিয়ে যা বলেছিলেন, আল্লাহ তা কুরআনে এভাবে তুলে ধরেছেন:
وَ لَا تُصَعِّرۡ خَدَّکَ لِلنَّاسِ وَ لَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ کُلَّ مُخۡتَالٍ فَخُوۡرٍ ﴿ۚ۱۸﴾
“অহঙ্কারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ১৮]
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের যা কিছু আছে—তা সবই আল্লাহর দান। তাই নিজের শক্তি, সম্পদ বা বংশ নিয়ে গর্ব করা এবং অন্যকে ছোট মনে করা ঈমানি চেতনার পরিপন্থী। বিনয়ই মুমিনের অলঙ্কার, আর অহঙ্কার হলো পতনের মূল।
লোক দেখানো আমলের ভয়াবহ পরিণতি
হাশরের সেই ভয়াবহ ময়দান। সূর্য মাথার খুব কাছে, মানুষের অস্থিরতা চরমে। বিচার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। সবাই ভাবছে, আজ হয়তো বড় বড় ইবাদতকারী, শহীদ আর দানবীররাই সবার আগে পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ ﷺ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন এক অদ্ভুত ও করুণ দৃশ্যের অবতারণা হবে। বিচারকের আসনে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা। আর বিচারের কাঠগড়ায় একে একে দাঁড় করানো হবে তিন ব্যক্তিকে।
১. বীরত্বের মোহ ও একজন ‘শহীদ’
প্রথমেই উপস্থিত করা হবে এমন একজনকে, যে আল্লাহর পথে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছিল বলে দাবি করে। আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে দেওয়া সুস্থতা ও শক্তির কথা মনে করিয়ে দেবেন। সে তা স্বীকার করবে।
আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, “আমার দেওয়া এই শক্তি তুমি কোন কাজে লাগিয়েছিলে?”
সে গর্বের সাথে বলবে, “হে প্রভু! আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি এবং নিজের প্রাণ দিয়ে শহীদ হয়েছি।”
তখন আল্লাহ বলবেন, “তুমি মিথ্যা বলছ! তুমি এই জন্য লড়াই করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে ‘বীর-বাহাদুর’ বলে। আর দুনিয়াতে তোমাকে তা বলাও হয়েছে (তোমার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে)।”
অতঃপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দেওয়া হবে। তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে দাউ দাউ করে জ্বলা জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
২. খ্যাতির নেশা ও একজন ‘বিদ্বান কারী’
এরপর আনা হবে এমন একজনকে, যে সারা জীবন দ্বীনী ইলম (জ্ঞান) চর্চা করেছে এবং সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করেছে। আল্লাহ তাকে তাঁর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে সে তা অকপটে স্বীকার করবে।
আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, “এই ইলম ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে তুমি কী আমল করেছ?”
সে বিনীত হয়ে বলবে, “প্রভু! আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করেছি, অন্যকে শিক্ষা দিয়েছি এবং দিনরাত আপনার কালাম তিলাওয়াত করেছি।”
আল্লাহ বলবেন, “তুমি মিথ্যা বলছ! তুমি ইলম শিখেছিলে যাতে লোকে তোমাকে ‘বড় আলেম’ বলে আর কুরআন পড়েছিলে যাতে সবাই তোমাকে ‘কারী’ বলে প্রশংসা করে। দুনিয়াতে সেই খ্যাতি তুমি পেয়ে গেছ।”
অতঃপর এই আলেমকেও অপমানজনকভাবে টেনে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।
৩. প্রশংসার কাঙাল ও একজন ‘দানবীর’
সবশেষে সেই বিত্তবান ব্যক্তিকে আনা হবে যাকে আল্লাহ অঢেল সম্পদ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাকে সম্পদের কথা মনে করিয়ে দিলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।
আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, “আমার দেওয়া এই সম্পদ তুমি কোথায় ব্যয় করেছ?”
সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবে, “হে আল্লাহ! এমন কোনো ভালো পথ নেই যেখানে আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য দান করিনি।”
আল্লাহ বলবেন, “তুমি মিথ্যা বলছ! তুমি এই উদ্দেশ্যে দান করেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে ‘বড় দানবীর’ বা দাতা বলে। দুনিয়াতে তোমাকে তা বলাও হয়েছে।”
অতঃপর তাকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে—ফেরেশতারা তাকে টানতে টানতে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।
(মুসলিম হাদিস: ১৯০৫ ‘নেতৃত্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৩, মিশকাত হাদিস: ২০৫, ‘ইলম’ অধ্যায়)
মেসওয়াক করার সুন্নাত ও ফযিলত
ইসলামে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো মেসওয়াক করা। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্যবিধি নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বিশেষ উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘মেসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতা ও প্রতিপালকের সন্তুষ্টি।’ (সহীহ মুসলিম)
মেসওয়াক করার গুরুত্বপূর্ণ সময়সমূহ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী বিশেষ কিছু সময়ে মেসওয়াক করার গুরুত্ব অপরিসীম:
* অজু ও নামাজের সময়: ইবাদতের পূর্বে মুখ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি প্রত্যেক অজুর সময় (অন্য বর্ণনায় নামাজের সময়) তাদের মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (বুখারী ও মুসলিম)
* ঘরে প্রবেশের সময়: বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর পরিবারের সাথে সাক্ষাতের আগে মুখ পরিচ্ছন্ন রাখা সুন্নাত। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী কারীম ﷺ যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন প্রথমেই মেসওয়াক করতেন।’ (সহীহ মুসলিম)
* ঘুম থেকে জাগার পর: দীর্ঘ সময় ঘুমানোর ফলে মুখে যে দুর্গন্ধ বা জড়তা তৈরি হয়, তা দূর করতে মেসওয়াক করা জরুরি। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে জাগ্রত হওয়ার পর মেসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন। (সহীহ বুখারী)
* কুরআন তেলাওয়াতের সময়: কুরআন আল্লাহর কালাম, তাই এটি পাঠের আগে মুখ পবিত্র রাখা জরুরি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মানুষ যখন মেসওয়াক করে সালাতে দাঁড়ায়, তখন ফেরেশতারা তার তেলাওয়াত শোনার জন্য এত কাছে চলে আসেন যে তাঁদের মুখ তেলাওয়াতকারীর মুখের কাছে থাকে। তাই কুরআনের সম্মানে মুখ পরিষ্কার রাখা উচিত। (মুসনাদে বাযযার)
মেসওয়াকের উপকারিতা
* এটি মুখের দুর্গন্ধ দূর করে এবং দাঁত ও মাড়ি মজবুত করে।
* এটি চোখের জ্যোতি বাড়াতে এবং হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে বলে উলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন।
* সবচেয়ে বড় কথা, এটি পালনের মাধ্যমে সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি প্রিয় সুন্নাত জিন্দা করা হয়।
অভিশাপ প্রদানের ভয়াবহতা ও ইসলামের বিধান
কাউকে অভিশাপ বা লানত দেওয়া অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ। রসূলুল্লাহ ﷺ মুমিনদের মুখ ও জিহ্বা সংযত রাখার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিসের আলোকে অভিশাপের ভয়াবহতা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মুসলিমকে গালি ও অভিশাপের পরিণতি
এক মুসলিম অন্য মুসলিমের সম্মান রক্ষা করা ঈমানের দাবি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
سباب المسلم فسوق وقتاله كفر».
“মুসলিমকে গালি দেওয়া বা অভিশাপ করা অন্যায় (ফাসেকী) এবং তাকে হত্যা করা কুফর।” [সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৬]
২. অভিশাপ যেভাবে নিজের দিকে ফিরে আসে
অভিশাপ একটি ভয়ংকর তীরের মতো, যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে নিক্ষেপকারীর বুকেই ফিরে আসে। আবু দাউদ শরীফের একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন:
ان العبد اذا لعن شيئ صعدت اللعنة الى السماء فتغلق أبواب السماء دونها ثم تهبط الى الأرض فتغلق أبوابها دونها ثم تأخذ يمينا وشالا فاذا لم تجد مساغا رجعت الى الذي لعن فان كان لذلك أهلا والا رجعت الى قائلها».
যখন কোনো ব্যক্তি কাউকে অভিশাপ দেয়, সেই অভিশাপটি আকাশে ওঠার চেষ্টা করে; কিন্তু আকাশের দরজাগুলো তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তা পৃথিবীতে নামতে চায়, কিন্তু যমীনের দরজাও বন্ধ হয়ে যায়, অতঃপর সেটি ডানে-বামে ঘুরতে থাকে এবং কোথাও আশ্রয় না পেয়ে সেই ব্যক্তির কাছে যায় যাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। সেই ব্যক্তি অভিশাপের যোগ্য হয়, তবে তা কার্যকর হয়। আর যদি সে যোগ্য না হয়, তবে সেই অভিশাপ স্বয়ং অভিশাপকারীর ওপরই ফিরে আসে। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৪৬৫৯]
অভিশাপ দেওয়ার শরয়ী বিধান
* সাধারণভাবে হারাম: অকারণে বা ব্যক্তিগত রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো মুসলিম ভাইকে অভিশাপ করা সম্পূর্ণ হারাম।
* সাধারণ অভিশাপ (জায়েজ): নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম ধরে অভিশাপ না দিয়ে, পাপে লিপ্ত কোনো বিশেষ শ্রেণীর ওপর সাধারণ লানত করা জায়েজ। যেমন:
* অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।
* মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।
* কাফিরদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।
* সুদখোর বা প্রাণীর ছবি অঙ্কনকারীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।
পরিশেষে, একজন মুমিনের পরিচয় হলো তার মুখ থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকবে। অভিশাপ না দিয়ে বরং অন্যের হিদায়াত ও মঙ্গলের জন্য দোয়া করাই নববী আদর্শ।
রমাদানের আগমন ইমাম সালাফদের জন্য ছিল এক বিশেষ উৎকর্ষের সুযোগ—যেখানে তাদের ইবাদত, তিলাওয়াত ও নেক কাজের প্রচেষ্টা সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
হযরত শিবলী (রহ.) বলতেন—
“এটি এমন এক মাস যাকে আমার রব সম্মানিত করেছেন, তাই আমিই হবো প্রথম ব্যক্তি যে একে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে।”
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ: ১০