পরনিন্দা
ইসলামি শরীয়তে অন্যের দোষ চর্চা করা এবং প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর পরিণাম নিম্নরূপ:
১. নিন্দাকারীর দুর্ভোগ
সামনে কিংবা পেছনে—যেকোনোভাবেই মানুষের নিন্দা বা সমালোচনা করা পরকালের জন্য ধ্বংসাত্মক। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন:
وَیۡلٌ لِّکُلِّ هُمَزَۃٍ لُّمَزَۃِۣ ۙ﴿۱﴾
“দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গীবতকারী।”
[সূরা আল-হুমাযাহ, আয়াত: ১]
২. গীবত ও কুধারণার বীভৎসতা
মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত এবং পরনিন্দা কতটা জঘন্য, তা আল্লাহ তাআলা একটি উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ وَّ لَا تَجَسَّسُوۡا وَ لَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡهِ مَیۡتًا فَکَرِهۡتُمُوۡهُ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ تَوَّابٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۱۲﴾
“হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।”
[সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২]
আবূ যর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এর ইসলাম গ্রহণ
আরবের দুর্ধর্ষ গিফার গোত্রের এক যুবক—নাম তাঁর আবূ যর। একদিন কানে খবর এল, মক্কায় এক ব্যক্তি নিজেকে নবী দাবি করছেন। কৌতূহল দমনে না পেরে তিনি তাঁর ভাইকে পাঠালেন মক্কায়। ভাই ফিরে এসে জানাল, “তিনি তো কেবল সৎকাজের আদেশ দেন আর মন্দ কাজ থেকে বারণ করেন।” কিন্তু আবূ যরের অতৃপ্ত হৃদয় এই সামান্য খবরে শান্ত হলো না। তিনি নিজেই সত্যের তৃষ্ণা মেটাতে এক পাত্র পানি আর লাঠি নিয়ে রওনা হলেন মক্কার পথে।
অচেনা শহর মক্কায় পৌঁছে আবূ যর পড়লেন এক অদ্ভুত সংকটে। তিনি সেই নবীকে চেনেন না, আবার বৈরী পরিবেশে কাউকে জিজ্ঞেস করাও নিরাপদ মনে করছেন না। দিনের পর দিন তিনি নিঃশব্দে মসজিদে হারামে পড়ে রইলেন; তৃষ্ণা ও ক্ষুধা মেটানোর একমাত্র অবলম্বন ছিল পবিত্র যমযমের পানি।
একদিন সন্ধ্যায় হযরত আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এই নিঃসঙ্গ মুসাফিরকে লক্ষ্য করলেন। দয়াপরবশ হয়ে তিনি তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, দীর্ঘ তিন দিন তাঁরা একসাথে কাটালেন, অথচ একে অপরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করলেন না। শেষে আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, “কেন আপনি এই শহরে এসেছেন?”
আবূ যর সাবধানী ভঙ্গিতে বললেন, “যদি আপনি আমার বিষয়টি গোপন রাখার আশ্বাস দেন, তবেই বলতে পারি।” আশ্বাস পেয়ে তিনি তাঁর অন্তরের সুপ্ত বাসনা ব্যক্ত করলেন। আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু উজ্জ্বল হাসিতে বললেন, “আপনি সঠিক পথপ্রদর্শকই খুঁজে পেয়েছেন। আমি এখনই তাঁর কাছে যাচ্ছি, আপনি আমাকে অনুসরণ করুন। তবে সতর্কতা হিসেবে যদি পথে আমি জুতো ঠিক করার বাহানায় দেয়ালে গা ঘষে দাঁড়াই, তবে বুঝবেন বিপদ; আপনি তখন না থমকে সোজা হাঁটতে থাকবেন।”
অবশেষে আবূ যর রাদ্বিআল্লাহু আনহু সেই কাঙ্ক্ষিত দরবারে পৌঁছালেন। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নূরানি মুখচ্ছবি আর তাঁর দ্বীনের দাওয়াত শুনে মুহূর্তেই তাঁর হৃদয়ে ঈমানের বাতি জ্বলে উঠল। তিনি তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন। নবীজি তাঁকে পরামর্শ দিলেন, “এখনই তোমার ইসলাম প্রকাশ করো না, চুপচাপ নিজের দেশে ফিরে যাও। আমাদের বিজয়ের খবর পেলে তখন এসো।”
কিন্তু যাঁর হৃদয়ে সত্যের আগুন জ্বলে উঠেছে, তিনি কি আর চুপ থাকতে পারেন? আবূ যর রাদ্বিআল্লাহু আনহু দরাজ কণ্ঠে বললেন, “আল্লাহর শপথ! আমি কাফির-মুশরিকদের সামনে গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে তাওহীদের বাণী ঘোষণা করব।”
মুহূর্তেই তিনি পৌঁছে গেলেন কা’বা প্রাঙ্গণে। কুরাইশদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন— “হে কুরাইশগণ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা’বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” এক অপরিচিত যুবকের এই স্পর্ধা দেখে কুরাইশরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। “ধরো এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে!”—বলে তারা পঙ্গপালের মতো তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তাঁকে এমন নির্মমভাবে প্রহার করল যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার উপক্রম হলেন। ঠিক তখনই নবীজির চাচা আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু আনহু ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কুরাইশদের হুশিয়ার করে বললেন, “তোমরা কি পাগল হয়েছ? তোমরা গিফার গোত্রের এক যুবককে মারছ, অথচ তোমাদের সিরিয়া যাওয়ার বাণিজ্যিক পথটি তো গিফারদের এলাকায়! তাকে হত্যা করলে তোমাদের বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।” এই ভয়ে তারা পিছু হটল।
পরদিন সকালেও আবূ যর রাদ্বিআল্লাহু আনহু অদম্য সাহসে পুনরায় একই ঘোষণা দিলেন এবং আবারো নির্যাতনের শিকার হলেন। প্রতিবারই আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু আনহু কৌশলে তাঁকে রক্ষা করলেন। এভাবেই ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো এক অকুতোভয় ঈমানদারের সত্য জয়ের মহাকাব্য।
(বুখারী হাদিস: ৩৫২২ মানাকিব’ অধ্যায়, “আবু যর গিফারীর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা” অনুচ্ছেদ, হাদিস ৩৮৬১ ‘আনছারদের মর্যাদা’ অধ্যায়)
রমজান মাসে ওমরা পালন করা
হজ ও ওমরাহ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হজের সময় নির্ধারিত হলেও ওমরাহ বছরের যেকোনো সময় পালন করা যায়। পবিত্র রমজান মাসে এই ওমরাহ পালনের গুরুত্ব ও ফজিলত আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
১. গুনাহ মাফ ও রিজিকে বরকত
ওমরাহ পালনের মাধ্যমে মানুষের গুনাহ দূরীভূত হয় এবং রিজিকে বরকত আসে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
“এক ওমরার পর আরেক ওমরাহ—উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর জন্য কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) স্বরূপ। আর মাবরুর (কবুল) হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” [সহীহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩]
“তোমরা ধারাবাহিক হজ ও ওমরাহ আদায় করতে থাকো। এ দুটি আমল দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে বিদূরিত করে দেয়, যেমন ভাটার আগুন লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা-জং পরিষ্কার করে দেয়।” [তিরমিজি, হাদিস: ৮১০]
২. রমজানের ওমরাহ হজের সমতুল্য
রমজান মাসে ওমরাহ পালন করা অত্যন্ত বরকতময়, যা সওয়াবের দিক থেকে হজের সমতুল্য। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে:
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আনসারি নারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“রমজান এলে তখন ওমরাহ করে নিও। কেননা রমজানের একটি ওমরাহ (সওয়াবের দিক থেকে) একটি হজের সমতুল্য।”
[সহীহ বুখারি, হাদিস: ১৭৮২]
প্রতিবেশীদের কষ্ট দেওয়া
প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, তার জন্য জান্নাতের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেন,
«لايدخل الجنة من لا يأمن جاره بوائقه».
“ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অত্যাচার থেকে নিরাপদ থাকে না।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৬৬]
রমাদান সালাফদের কাছে ছিল এক অনন্য আধ্যাত্মিক মর্যাদার মাস, যেখানে প্রতিটি নেক কাজ এবং প্রতিটি আমল সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠতা লাভ করত।
হযরত ইমাম যুহরী (রহ.) বলেন—
“রমাদান মাসের একটি তাসবিহ অন্য মাসের হাজারটি তাসবিহের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।”
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ. ৯