দাওয়াত
দাওয়াত ও সৎকাজের আদেশ: উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি
ইসলামি জীবনদর্শনে দাওয়াত বা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটিই মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ঠ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১. একটি বিশেষ দলের আবশ্যকতা
সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য এমন একটি দল থাকা জরুরি যারা মানুষকে সবসময় কল্যাণের পথে ডাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ﴿۱۰۴﴾
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।”
[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪]
২. সর্বোত্তম উম্মত হওয়ার শর্ত
মুসলিম উম্মাহকে কেন ‘সর্বোত্তম উম্মত’ বলা হয়, তার কারণ বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ ؕ وَ لَوۡ اٰمَنَ اَهۡلُ الۡکِتٰبِ لَکَانَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ مِنۡهُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ اَکۡثَرُهُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ ﴿۱۱۰﴾
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশ হলো পাপাচারী।”
[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০]
হযরত আবূ নাজীহ (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এর ইসলাম গ্রহণ
জাহেলী যুগের সেই অন্ধকার সময়েও আবূ নাজীহ আমর ইবনু আবাসাহ রাদ্বিআল্লাহু আনহু-এর মন মূর্তিপূজাকে মেনে নিতে পারত না। তিনি ভাবতেন, “মানুষ ভুল পথে চলছে, পাথর কখনো উপাস্য হতে পারে না।” এমন সময় মক্কার এক ব্যক্তির অদ্ভুত খবর তাঁর কানে এল। তিনি দেরি না করে নিজের সওয়ারি নিয়ে মক্কায় পৌঁছে গোপনে সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করলেন। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আবূ নাজীহ নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?” নবীজি শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, “আমি নবী।” আবূ নাজীহ আবার প্রশ্ন করলেন, “নবী কী?” নবীজি বললেন, “আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, মূর্তি ভেঙে ফেলতে এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দিতে।” আবূ নাজীহ যখন জানতে চাইলেন এই কাজে তাঁর সাথে আর কে আছে, নবীজি জানালেন— “একজন স্বাধীন এবং একজন ক্রীতদাস” (অর্থাৎ তখন তাঁর সাথে কেবল আবূ বকর ও বেলাল রাদ্বিআল্লাহু আনহু ছিলেন)।
আবূ নাজীহ তখনই ঈমান আনতে চাইলেন। কিন্তু নবীজি বিচক্ষণতার সাথে বললেন, “এখন তুমি এই কাজ করতে পারবে না। আমার চারপাশের অবস্থা তো দেখছই। এখন ফিরে যাও, যখন দেখবে আমি বিজয়ী হয়েছি, তখন এসো।”
দীর্ঘ সময় পার হলো। নবীজি মক্কায় জুলুমের শিকার হয়ে মদীনায় হিজরত করলেন। আবূ নাজীহ সবসময় খবরাখবর নিতেন। একদিন মদীনা থেকে আসা কাফেলার মুখে শুনলেন, মানুষ দলে দলে নবীজির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি আর দেরি না করে মদীনায় পৌঁছে নবীজির খিদমতে হাজির হলেন। আবূ নাজীহ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?” নবীজি মুচকি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, তুমি তো সেই ব্যক্তি যে মক্কায় আমার সাথে দেখা করেছিলে।”
আবূ নাজীহ নবীজির কাছে দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখতে চাইলেন। নবীজি তাঁকে সূর্যোদয়, মধ্যাহ্ন এবং সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময়গুলো এড়িয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিস্তারিত নিয়ম বাতলে দিলেন। এরপর নবীজি ওযূর এক বিস্ময়কর ফজিলত বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন—
“যখন কেউ ওযূ করে কুলি করে ও নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে, তার চেহারা ও নাকের গুনাহগুলো ঝরে যায়। যখন মুখ ধোয়, তার দাড়ি বেয়ে পাপগুলো ঝরে পড়ে। হাতের কনুই ধোয়ার সময় নখ দিয়ে পাপগুলো বেরিয়ে যায় এবং পা ধোয়ার সময় পায়ের আঙ্গুলের ডগা দিয়ে গুনাহগুলো ঝরে যায়। এরপর যদি সে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে সালাত আদায় করে, তবে সে ঐদিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল।”
পরবর্তীতে সাহাবী আবূ উমামাহ রাদ্বিআল্লাহু আনহু যখন এই বিশাল সওয়াবের কথা শুনে কিছুটা অবাক হলেন, তখন বৃদ্ধ আবূ নাজীহ রাদ্বিআল্লাহু আনহু অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, “আমার বয়স হয়েছে, মৃত্যু নিকটে। এই অবস্থায় কি আমি নবীজির নামে মিথ্যা বলতে পারি? আমি যদি এটি তাঁর কাছে সাতবারও না শুনতাম, তবে বর্ণনা করতাম না। কিন্তু আমি তাঁর কাছে এর চেয়েও অনেক বেশিবার শুনেছি।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৩২]
ইতিকাফের বিধান ও ফজিলত
ইতিকাফ একটি আত্মশুদ্ধিমূলক ইবাদত, যা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভে বিশেষভাবে সাহায্য করে। এর বিভিন্ন প্রকার ও শর্তসমূহ নিম্নরূপ:
১. ইতিকাফের প্রকারভেদ ও সময়
সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়াহ: রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়াহ। অর্থাৎ মহল্লার কিছু মানুষ আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে।
নফল ইতিকাফ: শেষ দশকের কম যেকোনো সময় ইতিকাফ করলে তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। এটি বছরের যেকোনো সময় আদায় করা যায়।
ওয়াজিব ইতিকাফ: নফল ইতিকাফ মান্নত করলে বা আরম্ভ করে ছেড়ে দিলে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। এটি একদিনের (২৪ ঘণ্টা) কম হবে না।
২. রোজার শর্ত
পূর্ণ দিবস ইতিকাফ: পূর্ণ দিবস ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত।
স্বল্পকালীন ইতিকাফ: রমজানের বাইরে একদিনের কম সময় বা স্বল্প সময়ের জন্য নফল ইতিকাফ করলে তার জন্য রোজা রাখা শর্ত নয়।
ওয়াজিব ইতিকাফ: মান্নত করা বা ওয়াজিব ইতিকাফের ক্ষেত্রে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে।
৩. গুরুত্ব ও ফজিলত
সম্পূর্ণ সুন্নত ইতিকাফ পালন করতে না পারলেও যতটুকু সম্ভব নফল ইতিকাফ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দা দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়ার সুযোগ পায়।
আল্লাহর পাকড়াও থেকে নির্ভয় হওয়া ও অন্তরের অস্থিরতা
একজন মুমিন যত আমলই করুক না কেন, সে কখনো অহংকার করতে পারে না। কারণ ঈমানের ওপর অটল থাকা সম্পূর্ণ আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
১. অন্তরের পরিবর্তন ও নবীজির (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দোয়া
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পাঠ করতেন:
«يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قُلُوبَنَا عَلَى دِينِكَ»
অর্থ: “হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আপনি আমাদের অন্তরকে আপনার দীনের ওপর অটল রাখুন।”
যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদের ঈমানের ব্যাপারে আশঙ্কা করেন?” তখন তিনি উত্তর দিলেন:
“মানুষের অন্তর দয়াময় আল্লাহরই দুই আঙুলের মাঝে; তিনি যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে পরিবর্তন করেন।” [তিরমিযী, হাদীস নং: ২০৬৬]
২. আমল নিয়ে গর্ব করার পরিণাম
আপনার ঈমান, আমল, সালাত বা যেকোনো নেক আমল যতই সুন্দর হোক না কেন, তা নিয়ে অহংকার করবেন না। এগুলো আল্লাহর দান। তিনি চাইলে যেকোনো সময় তা ছিনিয়ে নিতে পারেন। মূর্খদের মতো ‘আমি অমুকের চেয়ে ভালো’—এমন দাবি করা থেকে বিরত থাকুন। সর্বদা নিজের দুর্বলতা ও গুনাহের আধিক্য অনুভব করে আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকুন।
৩. মুমিনের করণীয় ও আত্মশুদ্ধি
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:
«أَمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ»
অর্থ: “তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখবে, নিজের ঘরে (অপ্রয়োজনে বাইরে না গিয়ে ইবাদতে) মনোযোগী হবে এবং নিজের গুনাহের ওপর কান্নাকাটি করবে।” [তিরমিযী]
৪. আল্লাহর পাকড়াও সম্পর্কে সতর্কবাণী
আল্লাহর পাকড়াও থেকে যারা নিজেদের নিরাপদ মনে করে, তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ ۚ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
অর্থ: “তারা কি আল্লাহর পাকড়াও-এর ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে গেছে? ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন ব্যতীত কেউ আল্লাহর পাকড়াও থেকে নির্ভয় হয় না।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৯৯]
রমাদানের মাহাত্ম্য বোঝার জন্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা যথেষ্ট নয়; এটি আত্মদমন, নেক আমল এবং নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মাস।
আন্দালুসের শাসক আব্দুর রহমান বিন হাকাম আল-মারওয়ানি রমাদানের দিনে তাঁর এক দাসীর দিকে তাকালেন এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তার সঙ্গে লিপ্ত হলেন। পরে তিনি লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ফকিহদের ডেকে তার তাওবা ও কাফফারা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন ইমাম ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া বললেন—
“আপনি একটানা দুই মাস রোজা রাখুন।”
উপস্থিত অন্যান্য আলেমরা চুপ ছিলেন। সভা শেষে তাঁরা ইয়াহইয়াকে বললেন, “আপনি কেন আমাদের মালেকি মাযহাব অনুযায়ী ফতোয়া দেননি যে—গোলাম আজাদ করা, রোজা রাখা অথবা মিসকিন খাওয়ানোর মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ তার আছে?”
ইমাম ইয়াহইয়া উত্তর দিলেন—
“আমরা যদি তার জন্য এই সহজ পথ (গোলাম আজাদ করা) খুলে দিতাম, তবে তার জন্য প্রতিদিন এমন কাজ করা সহজ হয়ে যেত; সে শুধু একটি করে গোলাম আজাদ করত এবং নিজের লালসা পূরণ করত। তাই আমি তাকে সবচেয়ে কঠিন বিধানের ওপর বাধ্য করেছি, যাতে সে পুনরায় এমন কাজ করার সাহস না পায়।”
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ: ১৪