মুনাফিকদের পরিচয় ও তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের এমন কিছু আচরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা একজন মুমিনকে তাদের চেনার ক্ষেত্রে সতর্ক করে।
১. দ্বিমুখী নীতি ও সত্য গোপন করা
মুনাফিকরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মুমিনদের সাথে একরকম এবং নিজেদের দলের সাথে অন্যরকম আচরণ করে। তারা সত্য প্রকাশ করতে ভয় পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ اِذَا لَقُوا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚۖ وَ اِذَا خَلَا بَعۡضُهُمۡ اِلٰی بَعۡضٍ قَالُوۡۤا اَتُحَدِّثُوۡنَهُمۡ بِمَا فَتَحَ اللّٰهُ عَلَیۡکُمۡ لِیُحَآجُّوۡکُمۡ بِهٖ عِنۡدَ رَبِّکُمۡ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۷۶﴾
“যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে: আমরা মুসলমান হয়েছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, তখন বলে, পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তাদের কাছে বলে দিচ্ছ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে পালনকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি কর না?”
[সূরা বাকারা, আয়াত: ৭৬]
২. কুরআন ও সুন্নাহর বিধান থেকে বিমুখতা
যখনই তাদের আল্লাহর বিধান ও রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শের দিকে ডাকা হয়, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَ اِذَا قِیۡلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡا اِلٰی مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ وَ اِلَی الرَّسُوۡلِ رَاَیۡتَ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یَصُدُّوۡنَ عَنۡکَ صُدُوۡدًا ﴿ۚ۶۱﴾
“আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো—যা তিনি রসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফেকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে।”
[সূরা নিসা, আয়াত: ৬১]
৩. অহংকার ও হঠকারিতা
মুনাফিকরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে উল্টো অহংকার প্রদর্শন করে। তাদের এই স্বভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وَ اِذَا قِیۡلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡا یَسۡتَغۡفِرۡ لَکُمۡ رَسُوۡلُ اللّٰهِ لَوَّوۡا رُءُوۡسَهُمۡ وَ رَاَیۡتَهُمۡ یَصُدُّوۡنَ وَ هُمۡ مُّسۡتَکۡبِرُوۡنَ ﴿۵﴾
“যখন তাদেরকে বলা হয়: তোমরা এসো, আল্লাহর রসূল তোমাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন, তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং আপনি তাদেরকে দেখেন যে, তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
[সূরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৫]
উয়াইস কারনীর মর্যাদা
হযরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু যখন খলীফা, তখন ইয়ামান থেকে কোনো সাহায্যকারী দল এলেই তিনি ব্যাকুল হয়ে খুঁজতেন— “তোমাদের মাঝে কি উয়াইস ইবনু আমির আছে?” দীর্ঘ অপেক্ষার পর একদিন সত্যিই উয়াইস কারনী এসে হাজির হলেন।
রাদ্বিআল্লাহু আনহু তাঁকে একে একে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি মুরাদ গোত্রের ‘কারন’ শাখার লোক?” উয়াইস বললেন, “হ্যাঁ।” ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল এবং এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকি শরীর সুস্থ হয়ে গেছে?” তিনি অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ।” খলীফা শেষ প্রশ্নটি করলেন, “আপনার মা কি জীবিত আছেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”
তখন ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু আবেগময় কণ্ঠে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি— “ইয়ামানের সাহায্যকারী দলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির নামে এক লোক তোমাদের নিকট আসবে। সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে আল্লাহর ওপর ভরসা করে কোনো শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। হে ওমর! তুমি যদি তাকে দিয়ে তোমার গুনাহ মাফের জন্য দোআ করাতে পারো, তবে অবশ্যই তা করবে।”
এরপর ইসলামের মহান খলীফা হয়েও ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু এই সাধারণ মানুষের কাছে নিজের জন্য দোআ চাইলেন এবং উয়াইস কারনী তাঁর জন্য দোআ করলেন। খলীফা তাঁকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইলে উয়াইস বিনয়ের সাথে বললেন, “সাধারণ মানুষের মাঝে সাদামাটা জীবন কাটানোই আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়।”
এর পরের বছর কূফার এক নেতা হজে এলে ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু উয়াইসের খোঁজ নিলেন। সেই নেতা জানাল, উয়াইস অত্যন্ত জীর্ণ এক ঘরে অতি সামান্য সম্বল নিয়ে বাস করেন। ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু তাকেও নবীজির সেই নসিহত শোনালেন। লোকটি মদীনা থেকে ফিরে উয়াইসের কাছে গিয়ে নিজের জন্য দোআ চাইল। উয়াইস প্রথমে বিনয় প্রকাশ করে বললেন, “আপনি এইমাত্র হজের বরকতময় সফর থেকে ফিরলেন, আপনিই বরং আমার জন্য দোআ করুন।” কিন্তু যখন লোকটি খলীফার সাথে সাক্ষাতের কথা জানাল, তখন উয়াইস তাঁর জন্য দোআ করলেন। এই ঘটনার পর যখন লোকেরা তাঁর উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে জেনে গেল, তখন প্রচারবিমুখ এই ওলী লোকচক্ষুর আড়ালে অন্য জায়গায় চলে গেলেন।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, উয়াইস তাঁর মাকে দেখাশোনার জন্য রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশায় মক্কায় আসতে পারেননি। কিন্তু মায়ের প্রতি এই অকৃত্রিম সেবাই তাঁকে আল্লাহর কাছে এত প্রিয় করে তুলেছিল যে, স্বয়ং নবীজি তাঁর জন্য দোআ করার নির্দেশ বড় বড় সাহাবীদের দিয়ে গিয়েছিলেন। নবীজি তাঁকে ‘তাবেঈদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সৎ লোক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৪২, ‘সাহাবীগণের মর্যাদা’ অধ্যায়]
ইফতারের দাওয়াত দেওয়া ও ইফতার বিতরণ: একটি মহান সুন্নাত
রমজান মাস তাকওয়া অর্জনের মাস। এই মাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে যা রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত। এই সুন্নাতগুলো পালনের মাধ্যমে একজন রোজাদার আল্লাহর অতি প্রিয় বান্দায় পরিণত হতে পারেন।
ইফতার করানোর ফজিলত
অন্যকে ইফতার করানো বা ইফতারি বিতরণ করা প্রিয়নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্নাত। এই আমলের সওয়াব সম্পর্কে তিনি এক মহান ঘোষণা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব লাভ করবে; এতে ইফতারকারীর (রোজাদারের) সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।”
সামাজিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
সওয়াব বৃদ্ধি: নিজের রোজার সওয়াবের পাশাপাশি অন্যকে ইফতার করিয়ে আরও অনেক রোজার সওয়াব অর্জনের এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।
ভ্রাতৃত্ব বন্ধন: ইফতারের দাওয়াত ও বিতরণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
তাকওয়া অর্জন: অভাবী ও সাধারণ রোজাদারদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া খোদাভীতি ও মহানুভবতার পরিচয়।
যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের উচিত এই বরকতময় সুন্নাতটি পালনের মাধ্যমে রমজানের পূর্ণ ফজিলত হাসিল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই আমলটি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
জুম‘আর সালাত ও জামা‘আত বর্জন করার পরিণাম
ইসলামে জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় এবং জুম‘আর গুরুত্ব অপরিসীম। উপযুক্ত কারণ ছাড়া এগুলো অবহেলা করা অত্যন্ত বড় অপরাধ, যা একজন মুমিনকে ঈমানি অলসতা ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
১. জুম‘আর সালাত ত্যাগের পরিণাম: অন্তরে মোহর লেগে যাওয়া
জুম‘আর সালাত ছেড়ে দেওয়া কেবল একটি আমল বাদ দেওয়া নয়, বরং এটি অন্তরের পবিত্রতা হারানোর কারণ। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন:
«ليتهين أقوام عن ودعهم الجمعات أو ليختمن الله على قلوبهم ثم ليكونن من الغافلين».
যদি মানুষ জুমু‘আর সালাত পরিত্যাগ করে থাকে, তবে আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিবেন, যার ফলে তারা অলস (অজ্ঞ ও গাফেল) ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সুনানে দারেমী, হাদিস নং: ১৫২৪]
২. আযান শোনার পর জামা‘আতে উপস্থিত না হওয়া
জামা‘আতের সাথে সালাত আদায়ের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, আযান শোনার পর ওযর ছাড়া একাকী সালাত আদায় করলে তার পূর্ণ মর্যাদা পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
«من سمع النداء فلم يأته فلا صلاة له الا من عذر».
যে ব্যক্তি আযান শুনল অথচ কোনো প্রকার ওযর (যথোপযুক্ত কারণ) ছাড়া সালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হলো না, তার সালাত (আল্লাহর নিকট) কবুল হয় না।” [সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস নং: ৭৮৫]
রমাদান মাসে সালাফরা জানতেন যে মাসশেষের মুহূর্তগুলোও আল্লাহর নিকট বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাই তারা শুধু রোজা রাখাই নয়, বরং ক্ষমা প্রার্থনা ও নেক কাজের মাধ্যমে মাসটি পূর্ণতায় পৌঁছাতেন।
খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) বিভিন্ন জনপদের মানুষদের কাছে লিখে পাঠাতেন যাতে তারা রমাদান মাসের সমাপ্তি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) এবং সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে পূর্ণ করে।
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ: ১৪