শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার নির্দেশ
মানবজাতির চিরশত্রু শয়তান মানুষকে বিপথগামী করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই শত্রু সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করেছেন।
১. হালাল আহার ও শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা
পবিত্র ও হালাল রিজিক গ্রহণ করা ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। শয়তান মানুষকে হারাম ও অপবিত্রের দিকে প্রলুব্ধ করে। আল্লাহ বলেন:
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۱۶۸﴾
“হে মানুষ, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু।”
[সূরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮]
২. ইসলামে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশ ও আনুগত্য
খণ্ডিতভাবে নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান মেনে চলাই হলো শয়তানের হাত থেকে বাঁচার উপায়। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۲۰۸﴾
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু।”
[সূরা বাকারা, আয়াত: ২০৮]
৩. দারিদ্র্যের ভয় ও অশ্লীলতার প্ররোচনা
শয়তান মানুষের মনে অভাব-অনটনের ভয় ঢুকিয়ে দেয় যেন মানুষ দান-সদকা না করে এবং তাকে অশ্লীল কাজের দিকে ঠেলে দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ ভিন্ন:
اَلشَّیۡطٰنُ یَعِدُکُمُ الۡفَقۡرَ وَ یَاۡمُرُکُمۡ بِالۡفَحۡشَآءِ ۚ وَ اللّٰهُ یَعِدُکُمۡ مَّغۡفِرَۃً مِّنۡهُ وَ فَضۡلًا ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۶۸﴾ۖۙ
“শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্রতার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।”
[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬৮]
৪. অমূলক ভয় ও প্রকৃত আল্লাহভীতি
শয়তান মুমিনদের মনে কাফের-মুশরিক বা বাতিল শক্তির ভয় সৃষ্টি করে ঈমান দুর্বল করতে চায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
اِنَّمَا ذٰلِکُمُ الشَّیۡطٰنُ یُخَوِّفُ اَوۡلِیَآءَهٗ ۪ فَلَا تَخَافُوۡهُمۡ وَ خَافُوۡنِ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ﴿۱۷۵﴾
“সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের (কাফের, মুশরিক, মুনাফিক) ভয় দেখায়। তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও।”
[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৫]
দানের ফজিলত
দানের এক বিস্ময়কর গল্প
বহু বছর আগের কথা। এক লোক বিশাল এক নির্জন মাঠের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আকাশ ছিল মেঘলা। হঠাৎ সেই পথিক মেঘের ভেতর থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। কোনো মানুষ নয়, বরং মেঘকে উদ্দেশ্য করে কেউ আদেশ দিচ্ছে— “অমুকের বাগানে গিয়ে পানি দাও!”
পথিক তো অবাক! সে উৎসুক হয়ে দেখতে লাগল মেঘটি কোন দিকে যায়। দেখা গেল, মেঘমালা একটি নির্দিষ্ট দিকে ভেসে গিয়ে এক পাথুরে জমিতে অঝোরে বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করল। বৃষ্টির পানি নালা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। কৌতূহলী পথিক সেই পানির স্রোত অনুসরণ করে এগোতে লাগল।
কিছুদূর গিয়ে সে দেখল, এক ব্যক্তি বাগানে দাঁড়িয়ে কোদাল দিয়ে অতি যত্ন করে পানি আটকে নিজের বাগানে সেচ দিচ্ছে। পথিক লোকটির কাছে গিয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর বান্দা! আপনার নাম কী?”
লোকটি নিজের নাম বলল। পথিক চমকে উঠল! কারণ এই নামটিই সে একটু আগে মেঘের গর্জন থেকে শুনতে পেয়েছিল। লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, আপনি কেন আমার নাম জানতে চাইলেন?”
পথিক তখন মেঘের সেই অলৌকিক নির্দেশের কথা খুলে বলল এবং বিস্ময়ের সাথে জানতে চাইল, “হে আল্লাহর বান্দা! আপনি আপনার এই বাগানে এমন কী বিশেষ কাজ করেন যে, আকাশ থেকে আপনার নামে বৃষ্টির অর্ডার আসে?”
তখন সে মুচকি হেসে তাঁর জীবনের গোপন সূত্রটি প্রকাশ করলেন:
“আপনি যখন জিজ্ঞেসই করলেন, তবে শুনুন— এই বাগানে যা উৎপাদন হয়, আমি তাকে সমান তিন ভাগে ভাগ করি:
১. এক ভাগ আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরিব-অসহায়দের মাঝে দান করে দেই।
২. এক ভাগ আমি ও আমার পরিবার মিলে ভোগ করি।
৩. আর বাকি এক ভাগ পুনরায় চাষাবাদের জন্য বাগানে খাটাই।”
এভাবেই আল্লাহ তাআলা সেই দানশীল ব্যক্তির বাগানের দায়িত্ব যেন মেঘের ওপর অর্পণ করেছিলেন। দানি ব্যক্তির সামান্য দান যে তাঁর সম্পদে কতটা বরকত আনে, এই ঘটনাটি তারই অকাট্য প্রমাণ।
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৯৮৪)
ঈদের দিনের সুন্নাত আমলসমূহ
ঈদের খুশিকে পূর্ণতা দিতে এবং সওয়াব অর্জনের লক্ষ্যে নিচের আমলগুলো পালন করা আমাদের কর্তব্য:
১. ফজরের নামাজ জামাআতে আদায় করা:
ঈদের আনন্দ যেন আমাদের ফজর নামাজ থেকে গাফেল না করে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশা ও ফজরের জামাআতের গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, মানুষ যদি এই দুই নামাজের সওয়াব জানত, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও জামাআতে উপস্থিত হতো। [বুখারি ও মুসলিম]
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও গোসল:
ঈদের নামাজের পূর্বে উত্তমরূপে গোসল করা সুন্নাত। হযরত ইবনে ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন।
৩. সর্বোত্তম পোশাক ও সুগন্ধি ব্যবহার:
সাধ্যমতো নিজের কাছে থাকা সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা। আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর দেওয়া নিয়ামতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।
৪. ফিতরা আদায় করা:
ঈদুল ফিতরের দিন নামাজে যাওয়ার আগেই ‘সাদকায়ে ফিতর’ আদায় করা সুন্নাত, যাতে সমাজের গরিব-দুঃখীরাও ঈদের খুশিতে শামিল হতে পারে।
৫. ঈদের নামাজের আগে কিছু খাওয়া:
ঈদুল ফিতরের দিন কোনো কিছু না খেয়ে ঈদগাহে না যাওয়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদগাহে বের হতেন।
৬. ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া:
কোনো বিশেষ সমস্যা না থাকলে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত।
৭. যাতায়াতের পথ পরিবর্তন করা:
ঈদগাহে যাওয়ার সময় যে পথে যাবেন, ফেরার সময় অন্য পথে ফিরে আসা সুন্নাত। এতে করে উভয় পথের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সম্ভব হয়। [বুখারি]
৮. তাকবির পাঠ করা:
ঈদের দিন ঘর থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে ঈদগাহে পৌঁছানো এবং নামাজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত উচ্চস্বরে (বা মনে মনে) তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে তাঁর বড়ত্ব প্রকাশের (তাকবির) নির্দেশ দিয়েছেন। [সূরা বাকারা: ১৮৫]
৯. ঈদের নামাজ ও খুতবা শ্রবণ:
ইমামের সাথে জামাআতে ঈদের নামাজ আদায় করা। নামাজ শেষে খুতবা শোনা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, খুতবা শোনার জন্য বসা ভালো, তবে কেউ চলে যেতে চাইলে তার অনুমতি আছে। [আবু দাউদ]
প্রতিটি কাজ যদি সুন্নাত তরিকায় করা হয়, তবে আনন্দ করার পাশাপাশি আমাদের আমলনামায় বিপুল সওয়াব যুক্ত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই আমলগুলো সঠিকভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহর রহমত: আশার আলো ও মুমিনের বিশ্বাস
বিপদ-আপদ বা গুনাহের আধিক্য—যেকোনো পরিস্থিতিতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। একজন মুমিন সর্বদা আল্লাহর দয়ার ওপর ভরসা রাখবে।
১. নিরাশা কাফিরদের বৈশিষ্ট্য
মুমিনের জীবনে চরম হতাশার কোনো স্থান নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন:
﴿وَلَا تَاْيَۡٔسُواْ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِۖ إِنَّهُۥ لَا يَاْيَۡٔسُ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡقَوۡمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ﴾ [يوسف: ٨٧]
“তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে একমাত্র কাফির সম্প্রদায়ই নিরাশ হয়।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৭]
২. মৃত্যুর আগে আল্লাহর প্রতি সুধারণা
মুমিন ব্যক্তি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর ক্ষমার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لايموتن أحدكم إلا وهو يحسن الظن بالله».
“তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা (সুধারণা) পোষণ করা ছাড়া মৃত্যুবরণ না করে।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৫১২৫]
রমাদানের রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বিরোধী ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও নেক আমলের এক সূক্ষ্ম মাধ্যম। রোজার ত্রুটি পূরণ করা এবং আত্মাকে পরিপূর্ণ করা ছিল সালাফদের অঙ্গীকার।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন—
“গীবত বা পরনিন্দা রোজা ছিঁড়ে ফেলে, আর ইস্তিগফার সেই ছেঁড়া অংশ তালি দিয়ে ঠিক করে দেয়। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তালি দেওয়া (ত্রুটিমুক্ত) রোজা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারে, সে যেন তা-ই করে।”
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ: ১৪