হযরত মুহাম্মদ ﷺ: মর্যাদা ও মহিমা
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় তাঁর রাসূল ﷺ-এর শান ও মান এভাবে বর্ণনা করেছেন:
لَا تَجۡعَلُوۡا دُعَآءَ الرَّسُوۡلِ بَیۡنَکُمۡ کَدُعَآءِ بَعۡضِکُمۡ بَعۡضًا ؕ قَدۡ یَعۡلَمُ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ یَتَسَلَّلُوۡنَ مِنۡکُمۡ لِوَاذًا ۚ فَلۡیَحۡذَرِ الَّذِیۡنَ یُخَالِفُوۡنَ عَنۡ اَمۡرِهٖۤ اَنۡ تُصِیۡبَهُمۡ فِتۡنَۃٌ اَوۡ یُصِیۡبَهُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۶۳﴾
তোমরা একে অপরকে যেভাবে (নাম ধরে বা সাধারণ স্বরে) ডাকো, আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে সেভাবে ডেকো না। তোমাদের মধ্যে যারা অজুহাত দেখিয়ে চুপিসারে সরে পড়ে, আল্লাহ তাদের ভালো করেই জানেন। অতএব, যারা রাসূলের আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক থাকে যে—তাদের ওপর কোনো কঠিন বিপর্যয় নেমে আসতে পারে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পৌঁছাতে পারে।
[সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬৩]
مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَ لٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰهِ وَ خَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ وَ کَانَ اللّٰهُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا ﴿۴۰﴾
মুহাম্মদ ﷺ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামুন নাবিয়্যীন)। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।
[সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪০]
وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ اٰمَنُوۡا بِمَا نُزِّلَ عَلٰی مُحَمَّدٍ وَّ هُوَ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّهِمۡ ۙ کَفَّرَ عَنۡهُمۡ سَیِّاٰتِهِمۡ وَ اَصۡلَحَ بَالَهُمۡ ﴿۲﴾
আর যারা ঈমান এনেছে, নেক কাজ করেছে এবং মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে (আল-কুরআন)—যা তাদের রবের পক্ষ থেকে ধ্রুব সত্য—তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে; আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দেবেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন।
[সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২]
اَلَمۡ نَشۡرَحۡ لَکَ صَدۡرَکَ ۙ﴿۱﴾ وَ وَضَعۡنَا عَنۡکَ وِزۡرَکَ ۙ﴿۲﴾ الَّذِیۡۤ اَنۡقَضَ ظَهۡرَکَ ۙ﴿۳﴾ وَ رَفَعۡنَا لَکَ ذِکۡرَکَ ؕ﴿۴﴾ فَاِنَّ مَعَ الۡعُسۡرِ یُسۡرًا ۙ﴿۵﴾ اِنَّ مَعَ الۡعُسۡرِ یُسۡرًا ؕ﴿۶﴾ فَاِذَا فَرَغۡتَ فَانۡصَبۡ ۙ﴿۷﴾ وَ اِلٰی رَبِّکَ فَارۡغَبۡ ﴿۸﴾
(হে হাবিব!) আমি কি আপনার বক্ষ উন্মুক্ত করে দেইনি? আমি আপনার ওপর থেকে সেই ভারী বোঝা লাঘব করেছি, যা আপনার পিঠ ভেঙে দিচ্ছিল। আর আমি আপনার মর্যাদা ও আলোচনাকে (জগতজুড়ে) সমুন্নত করেছি। মনে রাখবেন, কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে; নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। অতএব, যখনই আপনি অবসর পান, ইবাদতে শ্রম দান করুন এবং আপনার প্রতিপালকের প্রতি একনিষ্ঠভাবে মনোনিবেশ করুন।
[সূরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ১-৮]
اِنَّاۤ اَعۡطَیۡنٰکَ الۡکَوۡثَرَ ؕ﴿۱﴾ فَصَلِّ لِرَبِّکَ وَ انۡحَرۡ ؕ﴿۲﴾ اِنَّ شَانِئَکَ هُوَ الۡاَبۡتَرُ ﴿۳﴾
নিশ্চয়ই আমি আপনাকে ‘কাউসার’ (জান্নাতি ঝরনা ও অফুরন্ত কল্যাণ) দান করেছি। অতএব, আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। নিশ্চয়ই আপনার শত্রুরাই হবে নির্বংশ ও শিকড়হীন।
[সূরা আল-কাউসার, আয়াত: ১-৩]
মূসা আলাইহিস সালাম ও খিযির আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী
একদা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর নবী! এই পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে?” মূসা আলাইহিস সালাম বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন, “আমিই সবচেয়ে জ্ঞানী।”
মূসা আলাইহিস সালাম-এর এই উত্তরটি আল্লাহর নিকট পছন্দ হলো না; কারণ তিনি মহাজ্ঞানের কৃতিত্ব আল্লাহর দিকে সোপর্দ না করে নিজের দিকে নিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানালেন, “হে মূসা! দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে আমার এমন এক বান্দা আছেন, যিনি তোমার চেয়েও অধিক জ্ঞানের অধিকারী।”
মূসা আলাইহিস সালাম অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে উঠলেন এবং সেই জ্ঞানীর সাথে সাক্ষাতের উপায় জানতে চাইলেন। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন, “একটি থলিতে করে একটি মাছ সাথে নাও। সফর করতে করতে যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই আমার সেই বান্দার দেখা পাবে।”
মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর সফরসঙ্গী ইউশা বিন নূন আলাইহিস সালাম-কে নিয়ে রওয়ানা হলেন। পথ চলতে চলতে তাঁরা একটি বড় পাথরের কাছে পৌঁছে বিশ্রাম নিতে বসলেন। মূসা আলাইহিস সালাম ঘুমিয়ে পড়লেন। অলৌকিকভাবে থলিতে রাখা মৃত মাছটি জ্যান্ত হয়ে লাফিয়ে সমুদ্রে চলে গেল এবং নিজের চলার পথে সুড়ঙ্গের মতো পথ তৈরি করল। ইউশা বিন নূন আলাইহিস সালাম এই আশ্চর্যজনক দৃশ্য দেখলেও মূসা আলাইহিস সালাম-কে জাগ্রত হওয়ার পর কথাটি বলতে ভুলে গেলেন।
তাঁরা আবার চলতে থাকলেন। পরদিন সকালে মূসা আলাইহিস সালাম যখন ক্লান্তিবোধ করলেন এবং খাবার চাইলেন, তখন ইউশা বিন নূন আলাইহিস সালাম বললেন, “হে আল্লাহর নবী! আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? সেই পাথরটির কাছে মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে সমুদ্রে চলে গিয়েছিল, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় আমি আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।”
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, “আমরা তো সেই স্থানটিরই সন্ধান করছিলাম!” তাঁরা পুনরায় নিজেদের পদচিহ্ন ধরে সেই পাথরের কাছে ফিরে আসলেন। সেখানে তাঁরা এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, যিনি কাপড় মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনিই ছিলেন হযরত খিযির আলাইহিস সালাম।
মূসা আলাইহিস সালাম তাঁকে সালাম দিলেন। খিযির আলাইহিস সালাম বিস্মিত হয়ে বললেন, “এই নির্জন প্রান্তরে সালাম কোথা থেকে এলো?” পরিচয় হওয়ার পর মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে থেকে জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। খিযির আলাইহিস সালাম বললেন, “হে মূসা! আল্লাহ আমাকে এমন কিছু জ্ঞান দিয়েছেন যা আপনি জানেন না, আবার আপনাকেও এমন কিছু জ্ঞান দিয়েছেন যা আমি জানি না। আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না।”
মূসা আলাইহিস সালাম প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, ইনশাআল্লাহ তিনি ধৈর্য ধরবেন। খিযির আলাইহিস সালাম শর্ত দিলেন যে, সফর চলাকালীন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা যাবে না।
প্রথম পরীক্ষা: নৌকা ছিদ্র করা
তাঁরা একটি নৌকায় উঠলেন। মাঝিরা তাঁদের বিনা ভাড়ায় তুলে নিল। নৌকায় ওঠার পর একটি চড়ুই পাখি সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা পানি পান করল। খিযির আলাইহিস সালাম বললেন, “হে মূসা! আল্লাহর মহাজ্ঞানের কাছে আমার আর আপনার জ্ঞান এই পাখির ঠোঁটে তোলা এক ফোঁটা পানির মতোও নয়।” হঠাৎ খিযির আলাইহিস সালাম কুড়াল দিয়ে নৌকার একটি তক্তা খুলে ফেললেন। মূসা আলাইহিস সালাম স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি বলে উঠলেন, “একি করলেন! যে লোকগুলো আমাদের উপকার করল, আপনি তাদের নৌকা ছিদ্র করে দিলেন?” খিযির আলাইহিস সালাম তাঁকে শর্তের কথা মনে করিয়ে দিলে মূসা আলাইহিস সালাম ক্ষমা চাইলেন।
দ্বিতীয় পরীক্ষা: বালক হত্যা
কিছু দূর যাওয়ার পর তাঁরা একদল বালকের সাথে দেখা পেলেন যারা খেলা করছিল। খিযির আলাইহিস সালাম এক জন বালককে ধরে হত্যা করে ফেললেন। মূসা আলাইহিস সালাম স্তম্ভিত হয়ে বললেন, “আপনি একজন নিষ্পাপ শিশুকে বিনা বিচারে হত্যা করলেন? এ তো অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ!” খিযির আলাইহিস সালাম পুনরায় তাঁর ধৈর্যের অভাবের কথা মনে করিয়ে দিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম লজ্জিত হয়ে বললেন, “এরপর যদি আমি কোনো প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমাকে আর সাথে রাখবেন না।”
তৃতীয় পরীক্ষা: দেয়াল মেরামত
তাঁরা একটি জনপদে পৌঁছালেন এবং সেখানকার মানুষের কাছে খাবার চাইলেন। কিন্তু বাসিন্দারা অত্যন্ত কৃপণ ছিল এবং মেহমানদারি করতে অস্বীকার করল। সেখানে একটি দেয়াল ছিল যা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। খিযির আলাইহিস সালাম কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই নিজ হাতে দেয়ালটি মেরামত করে দিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম অবাক হয়ে বললেন, “এই লোকগুলো আমাদের খাবার দিল না, অথচ আপনি পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদের দেয়াল ঠিক করে দিলেন?”
বিচ্ছেদ ও রহস্যের ব্যাখ্যা:
খিযির আলাইহিস সালাম বললেন, “এবার আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময় হয়ে গেছে। এখন শুনুন সেই রহস্যের কথা:”
১. নৌকা: নৌকাটি ছিল দরিদ্র কিছু মানুষের। সামনেই এক অত্যাচারী রাজা ছিল যে সব ভালো নৌকা কেড়ে নিচ্ছিল। আমি ছিদ্র করে দিয়ে নৌকাটি তাদের জন্য রক্ষা করেছি, যেন ত্রুটিযুক্ত দেখে রাজা এটি না নেয়।
২. বালক: সেই বালকটি ছিল কাফের এবং অবাধ্য। তার বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত নেককার। বড় হয়ে সে তাদের কষ্টের কারণ হতো, তাই আল্লাহ চাইলেন তাকে সরিয়ে তার চেয়ে উত্তম সন্তান দান করতে।
৩. দেয়াল: দেয়ালটি ছিল শহরের দুই ইয়াতীম বালকের। দেয়ালের নিচে তাদের পিতার রেখে যাওয়া গুপ্তধন ছিল। তাদের পিতা ছিলেন অত্যন্ত সৎ। দেয়ালটি পড়ে গেলে গুপ্তধন মানুষ নিয়ে যেত। তাই আল্লাহ চাইলেন তারা বড় হয়ে তাদের প্রাপ্য সম্পদ লাভ করুক।
খিযির আলাইহিস সালাম পরিশেষে বললেন, “হে মূসা! আমি নিজ ইচ্ছায় এসব করিনি, বরং আল্লাহর নির্দেশেই করেছি।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস :২৩৮০]
শিক্ষা:
* সকল জ্ঞানের প্রকৃত আধার আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
* জ্ঞান অর্জনের জন্য ধৈর্য ও সফর অত্যন্ত জরুরি।
* অহংকার জ্ঞানের পথে বড় বাধা; নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা উচিত নয়।
* মানুষের দৃষ্টিতে যা অমঙ্গলজনক মনে হয়, আল্লাহর ইচ্ছায় তার অন্তরালে গভীর কল্যাণ নিহিত থাকতে পারে।
আযানের সুন্নাত ও ফজিলতপূর্ণ আমলসমূহ
আযান কেবল নামাজের সংকেত নয়, বরং এটি মুমিনের জন্য বিপুল সওয়াব, গুনাহ মাফ এবং প্রিয় নবী ﷺ-এর শাফায়াত লাভের এক বিশেষ মুহূর্ত। আযানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো হলো:
১. মুআযযিনের শব্দের পুনরাবৃত্তি করা
মুআযযিন আযানের যে বাক্যগুলো বলবেন, শ্রবণকারীও ঠিক তা-ই বলবে। তবে যখন মুআযযিন ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ এবং ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ বলবেন, তখন তার জবাবে বলতে হবে:
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
(আল্লাহ ব্যতীত কোনো শক্তি এবং ক্ষমতা নেই।)
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৮৫। এই আমলটি জান্নাত নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যম।
২. বৃদ্ধাঙ্গুলি চুম্বন ও চোখে মাসেহ করা (মুস্তাহাব আমল)
আযানে যখন মুআযযিন ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলবেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসায় এই আমলটি করা মুস্তাহাব:
পঠিতব্য দোয়া:
প্রথমবার শোনার সময়: صَلَّى اللهُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ (সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ)।
দ্বিতীয়বার শোনার সময়: قُرَّةُ عَيْنِيْ بِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ (কুররাতু আইনী বিকা ইয়া রাসূলাল্লাহ)।
নিয়ম: এরপর উভয় হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ চুমু খেয়ে চোখের ওপর রেখে বলবে— اللَّهُمَّ مَتِّعْنِي بِالسَّمْعِ وَالْبَصَرِ (আল্লাহুম্মা মাত্তি’নী বিসসামই ওয়াল বাসার)।
দলিল ও ফযীলত:
ইমাম সাখাভী (রহ.): তাঁর ‘আল-মাকাসিদুল হাসানা’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, সায়্যিদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই আমলটি করতেন। নবীজি ﷺ তাঁর এই কাজ দেখে ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুর (আবু বকর) মতো আমল করবে, তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হবে।” (পৃষ্ঠা: ৬০৫, হাদিস নং: ১০২১)
ইমাম শামী (রহ.): বিশ্ববিখ্যাত হানাফি ফতোয়া গ্রন্থ ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ একে মুস্তাহাব বলেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, এই আমলকারীকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৯৮)
৩. শাহাদাত ও সন্তুষ্টির ঘোষণা (গুনাহ মাফের আমল)
আযানের মাঝেই অথবা আযান শেষে এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাত:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব, মুহাম্মদ ﷺ-কে রাসূল এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।)
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৮৬। এই দোয়া পাঠ করলে পাঠকারীর পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়।
৪. দরুদ শরীফ পাঠ করা
আযান শেষ হওয়ার পর প্রিয় নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা সুন্নাত:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَبَارِكْ وَسَلِّمْ
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৮৪। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “যে আমার ওপর একবার দরুদ পড়ে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাযিল করেন।”
৫. আযানের দোয়া (শাফায়াতের আরজি সহ)
দরুদ পাঠের পর আযানের বিশেষ দোয়াটি পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، وَارْزُقْنَا شَفَاعَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
(হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বানের রব এবং প্রতিষ্ঠিত সালাতের মালিক; আপনি মুহাম্মদ ﷺ-কে দান করুন ‘ওয়াসীলাহ’ ও উচ্চ মর্যাদা এবং তাঁকে পৌঁছে দিন ‘মাকামে মাহমুদ’-এ যার ওয়াদা আপনি তাঁকে করেছেন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের তাঁর শাফায়াত নসিব করুন, নিশ্চয়ই আপনি আপনার ওয়াদার ব্যতিক্রম করেন না।)
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬১৪। যে ব্যক্তি এই দোয়া পড়বে, কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ তার জন্য সুপারিশ করবেন।
৬. আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী দোয়া
আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। নবীজি ﷺ বলেছেন, “তুমি মুআযযিনের মতো বলো, আর যখন বলা শেষ হবে তখন আল্লাহর কাছে চাও, তোমাকে তা দেওয়া হবে।”
রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৫২১; সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ২১২।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহ পরিণাম
ইসলামে আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা ইবাদতের শামিল, আর এটি ছিন্ন করা অভিশপ্ত ও জঘন্য অপরাধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ فَأَصَمَّهُمۡ وَأَعۡمَىٰٓ أَبۡصَٰرَهُمۡ ٢٣﴾ [محمد: ٢٢، ٢٣]
“ক্ষমতা লাভের পর সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এই সেই লোক—যাদের প্রতি আল্লাহ লানত বা অভিসম্পাত করেন; অতঃপর তিনি তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিহীন করে দেন।”
[সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২২-২৩]
নিকট আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি ছাড়া জান্নাতে যাওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ সম্পর্কে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন:
«لايدخل الجنة قاطع رحم».
“আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৬৩৩]
রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণার নাম নয়; এটি আত্মার সংযম, আচরণের শুদ্ধতা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইবাদত। সালাফরা রোজাকে দেখতেন এক সমন্বিত সাধনা হিসেবে—যেখানে পুরো সত্তাই আল্লাহর দিকে নিবেদিত হয়।
হযরত হেলাল ইবনে হুবাব (রহ.) বর্ণনা করেন, তিনি ইমাম ইবনুল হানাফিয়াহ (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন—
“তোমার কান, চোখ, জিহ্বা এবং শরীর যেন রোজা রাখে। তোমার ইফতারের (সাধারণ) দিন আর রোজার দিন যেন এক সমান না হয়; আর খাদেমকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকো।”
— খালিদ আবু সালিহ, আস-সালাফু ওয়া তা’জিমু শানি রমাদান, পৃ: ৮