তাকদির
আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের স্রষ্টা এবং প্রতিটি বস্তুর ভাগ্য ও সীমা নির্ধারণকারী। পবিত্র কুরআনের আলোকে এর বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:
ۣالَّذِیۡ لَهٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ لَمۡ یَتَّخِذۡ وَلَدًا وَّ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ شَرِیۡکٌ فِی الۡمُلۡکِ وَ خَلَقَ کُلَّ شَیۡءٍ فَقَدَّرَهٗ تَقۡدِیۡرًا ﴿۲﴾
যাঁর অধিকারে রয়েছে আসমান ও যমীনের পূর্ণ মালিকানা; তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সার্বভৌমত্বে কোনো শরীক নেই। তিনি প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি বস্তুকে পরিমিতভাবে (একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ও ভাগ্যে) নির্ধারণ করেছেন।
[সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২]
وَ اَنۡ لَّیۡسَ لِلۡاِنۡسَانِ اِلَّا مَا سَعٰی ﴿ۙ۳۹﴾
মানুষ যা চেষ্টা করে, সে কেবল তা-ই পায়।
[সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৯] (অর্থাৎ, আল্লাহ ভাগ্য লিখে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই ফল পেতে হলে মানুষকে নিজ উদ্যোগে মেহনত করতে হয়। চেষ্টার পর মানুষ যা পায়, সেটাই তার জন্য নির্ধারিত তাকদির।)
اِنَّا کُلَّ شَیۡءٍ خَلَقۡنٰهُ بِقَدَرٍ ﴿۴۹﴾
নিশ্চয়ই আমি প্রতিটি বস্তুকে নির্দিষ্ট পরিমাপ (তাকদির) সহকারে সৃষ্টি করেছি।
[সূরা আল-কামার, আয়াত: ৪৯]
সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর হিকমতপূর্ণ বিচার
বনী ইসরাঈলের দুইজন মহিলা ছিল। তাদের প্রত্যেকের সাথে একটি করে দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিল। একদিন তারা বনের পথ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিল। হঠাৎ এক হিংস্র বাঘ এসে তাদের একজনের শিশুকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এই আকস্মিক বিপদে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ল।
যেই মহিলার শিশুটি বাঘে নিয়ে গিয়েছিল, সে নিজের শোক ভুলে অন্য মহিলার জীবিত শিশুটিকে নিজের বলে দাবি করতে লাগল। সে বলল, “তোমার ছেলেটিকেই বাঘে নিয়ে গেছে, এই শিশুটি আমার।” অন্য মহিলাটি প্রতিবাদ করে বলল, “না, বরং বাঘ তোমার ছেলেটিকেই নিয়ে গেছে, এই শিশুটি আমার।”
এই বিরোধ মীমাংসার জন্য তারা তৎকালীন নবী হযরত দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর দরবারে বিচারপ্রার্থী হলো। উভয় পক্ষের কথা শুনে হযরত দাঊদ আলাইহিস সালাম বয়স্কা মহিলাটির পক্ষে রায় দিলেন এবং শিশুটিকে তার হাতে তুলে দিলেন।
দুই মহিলা বিচারালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হযরত দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর পুত্র হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম-এর সামনে পড়ল। তারা তাঁকে পুরো বিষয়টি খুলে জানাল। তরুণ সুলায়মান আলাইহিস সালাম তাঁর প্রখর মেধা ও বিচক্ষণতা দিয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করলেন।
তিনি উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “তোমরা আমার নিকট একখানা ছোরা নিয়ে এসো। আমি শিশুটিকে সমান দুই টুকরো করে এই দুই মহিলার মধ্যে ভাগ করে দেব।”
এই ভয়াবহ প্রস্তাব শুনে বয়স্কা মহিলাটি চুপ করে থাকল, কারণ শিশুটি তার নিজের ছিল না। কিন্তু শিশুটির প্রকৃত মা—যিনি বয়সে ছিলেন অল্পবয়স্কা—তিনি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন। তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “তা করবেন না! আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। আমি আমার দাবি ছেড়ে দিচ্ছি, শিশুটি ওই মহিলার হাতেই দিয়ে দিন। তবুও দয়া করে ওকে মারবেন না!”
মায়ের এই আর্তনাদ শুনে হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন যে, কেবল প্রকৃত মা-ই নিজের সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে নিজের অধিকার ত্যাগ করতে পারেন। তিনি মুহূর্তেই রায় বদলে দিলেন এবং শিশুটি সেই অল্পবয়স্কা মহিলার (প্রকৃত মা) অনুকূলে ফিরিয়ে দিলেন।
সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৪২৭, সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৭২০, মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস নং: ৫৭১৯।
এই ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা:
মায়ের মমত্ববোধ: সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা অতুলনীয়। নিজের অধিকার হারানোর চেয়েও সন্তানের জীবন রক্ষা করা মায়ের কাছে বড়।
সুলায়মান আলাইহিস সালাম-এর বিচক্ষণতা: তিনি কেবল কথা শুনে নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের মাধ্যমে সত্যকে বের করে এনেছিলেন।
ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত: সঠিক বিচারের জন্য কেবল আইনের জ্ঞান যথেষ্ট নয়, বরং প্রজ্ঞা, গভীর দূরদর্শিতা ও হিকমত (কৌশল) অবলম্বন করা জরুরি।
পারস্পরিক সাক্ষাতের সুন্নাত ও আদবসমূহ
একজন মুসলিমের সাথে অন্য মুসলিমের দেখা হলে যে সুন্নাহগুলো পালন করা উচিত, তা কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয় বরং বিপুল সওয়াব ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির মাধ্যম।
১. সালাম প্রদান করা
সাক্ষাতের প্রথম সুন্নাত হলো সালাম দেওয়া। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শ্রেষ্ঠ ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
“লোকদের খাবার খাওয়ানো এবং তোমার পরিচিত ও অপরিচিত সবাইকে সালাম প্রদান করা।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
২. সালামকে পূর্ণাঙ্গভাবে বলা
সালামের উত্তর দেওয়ার সময় বা সালাম দেওয়ার সময় বাক্যটি বর্ধিত করলে নেকীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
‘আসসালামু আলাইকুম’ বললে ১০টি নেকী।
‘ওয়ারাহমাতুল্লাহ’ যুক্ত করলে ২০টি নেকী।
‘ওয়াবারাকাতুহু’ পর্যন্ত বললে ৩০টি নেকী হয়।
মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল আসার সময় নয়, বরং বিদায় নেওয়ার সময়ও পূর্ণ সালাম দেওয়া সুন্নাত।
৩. হাসিমুখে সাক্ষাত করা
সাক্ষাতের সময় গোমড়া মুখে না থেকে হাসিমুখে থাকা সুন্নাত। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ জ্ঞান করো না, এমনকি সেটি যদি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাতও হয়।” (সহীহ মুসলিম)
৪. মুসাফাহা বা করমর্দন করা
সালামের পর পরষ্পর হাত মেলানো বা মুসাফাহা করা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। হাদিসে এসেছে:
“যখন দুইজন মুসলিম পরষ্পর সাক্ষাত করে এবং মুসাফাহা (করমর্দন) করে, তারা আলাদা হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দেন।” (সুনানে আবু দাউদ)
৫. কালিমা তাইয়্যেবাহ বা উত্তম কথা বলা
সাক্ষাতের সময় কর্কশ বা অনর্থক কথা না বলে সুন্দর ও উত্তম ভাষায় কথা বলা উচিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
“আমার বান্দাদের বলুন যা উত্তম তা বলতে। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে মন্দের প্ররোচনা দেয়; নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের স্পষ্ট শত্রু।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৫৩)
নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন:
“একটি উত্তম কথা হলো একটি সাদাকাহ।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
কালিমা তাইয়্যেবাহর অন্তর্ভুক্ত বিষয়:
আল্লাহর স্মরণ ও জিকির।
একে অপরের জন্য নেক দোয়া করা।
কারো ভালো কাজের প্রশংসা ও উৎসাহ দেওয়া।
বিনম্র আচরণ ও সুন্দর ব্যবহার।
সমকামিতা ও অস্বাভাবিক যৌনাচার: এক ভয়াবহ পাপাচার
সৃষ্টির স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্ঘন করে কাম-তৃপ্তি চরিতার্থ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণী নিম্নরূপ:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হযরত লূত আলাইহিস সালাম-এর বর্ণনা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
﴿وَلُوطًا إِذۡ قَالَ لِقَوۡمِهِۦٓ أَتَأۡتُونَ ٱلۡفَٰحِشَةَ مَا سَبَقَكُم بِهَا مِنۡ أَحَدٖ مِّنَ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٨٠ إِنَّكُمۡ لَتَأۡتُونَ ٱلرِّجَالَ شَهۡوَةٗ مِّن دُونِ ٱلنِّسَآءِۚ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٞ مُّسۡرِفُونَ ٨١﴾ [الاعراف: ٨٠، ٨١]
“এবং আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম; সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল— তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বের কেউ করেনি? তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের নিকট গমন করো; বরং তোমরা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।”
[সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৮০-৮১]
সমকামিতা বা সমলিঙ্গের মানুষের সাথে যৌন সম্পর্কের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
«من وجدتموه يعمل عمل قوم لوط فاقتلوا الفاعل والمفعول».
“তোমরা কাউকে লূত সম্প্রদায়ের কাজে (সমকামিতা) লিপ্ত দেখলে, যে করছে এবং যার সাথে করা হচ্ছে— উভয়কেই হত্যা করো।”
[সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ১২৭৬]
স্বাভাবিক ও বৈধ পথ পরিত্যাগ করে কোনো পুরুষের সাথে কিংবা কোনো নারীর মলদ্বারে (পিছনের রাস্তা দিয়ে) সঙ্গম করা লানতযোগ্য কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«لا ينظر الله إلى رجل اتى رجلا او إمرآة في الدبر».
“আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেবেন না, যে কোনো পুরুষের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হয় অথবা কোনো নারীর মলদ্বারে সহবাস করে।”
[তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৬ ]
জ্ঞানচর্চায় নিবিষ্ট মহান আলিমরাও রমাদান এলে তাঁদের অগ্রাধিকার বদলে দিতেন—কারণ এ মাস ছিল কুরআনের সাথে একান্ত নির্জনতার সময়।
ইমাম মালিক (রহ.) সারা বছর মসজিদে নববী-তে হাদিস ও ফিকহের দারস-তাদরিসে ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু রমাদান মাস উপস্থিত হলে তিনি সব দারস বন্ধ করে দিতেন এবং পুরো মাস কুরআন তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকতেন—যেন জ্ঞানসমুদ্রের মাঝেও কুরআনের সান্নিধ্যই ছিল তাঁর আসল আশ্রয়।
— ইবনু রজব হাম্বলী, লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃ. ১৭১