প্রথমত: রসূলুল্লাহ ﷺ -এর পবিত্র হাদীসে স্পষ্টভাবেই নারী-পুরুষের নামাজের কয়েকটি ভিন্নতার কথা বর্ণিত হয়েছে। এ ভিন্নতার কথা বর্ণিত হয়েছে সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র ফতোয়া ও বাণীতেও। দীর্ঘ প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তা এমনই শক্তিশালী দলীলসমৃদ্ধ যে, সাহাবীযুগ থেকে শুরু করে প্রত্যেক যুগেরই বরেণ্য ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ এবং মুজতাহিদ ইমামগণ এ ভিন্নতার পক্ষেই তাদের মত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের সংকলিত ও রচিত বিভিন্ন হাদীসের কিতাব, হাদীসের কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ফিকহী রচনা—এসবই এর প্রমাণ বহন করে। যার কারণে পৃথিবীর দেশে দেশে মুসলিম নারীগণ তাদের নামাজে পুরুষদের সাথে যুগ যুগ ধরে যে ভিন্নতা রক্ষা করে চলছেন।
দ্বিতীয়ত: নারী-পুরুষের নামাজের পার্থক্য নির্দেশ করে এমন কয়েকটি হাদীস :
১. তাবেয়ী ইয়াযীদ ইবনে আবী হাবীব রহ. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাজরত দুই মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদেরকে (সংশোধনের উদ্দেশ্যে ) বললেন,
إِذَا سَجَدْتُمَا فَضُمَّا بَعْضَ اللَّحْمِ إِلَى الأَرْضِ ، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ لَيْسَتْ فِي ذَلِكَ كَالرَّجُلِ
‘যখন সেজদা করবে তখন শরীর জমিনের সাথে মিলিয়ে রাখবে। কেননা মহিলারা এ ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নয়।’ (কিতাবুল মারাসীল, ইমাম আবু দাউদ :৮০ সুুনানুলকুবরা, বাইহাকী :৩০১৬)
২. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِذَا جَلَسْتِ الْمَرْأَةُ فِى الصَّلاَةِ وَضَعَتْ فَخِذَهَا عَلَى فَخِذِهَا الأُخْرَى ، وَإِذَا سَجَدْتْ أَلْصَقَتْ بَطْنَهَا فِى فَخِذَيْهَا كَأَسْتَرِ مَا يَكُونُ لَهَا ، وَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْظُرُ إِلَيْهَا وَيَقُولُ : يَا مَلاَئِكَتِى أُشْهِدُكُمْ أَنِّى قَدْ غَفَرْتُ لَهَا
‘কোনো নারী যখন নামাজে বসে তখন যেন সে তার (ডান) উরু অপর উরুর উপর রাখে। আর যখন সে সেজদা করে তখন যেন পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে; যা তার সতরের জন্যে অধিক উপযোগী। আল্লাহ তায়ালা তাকে দেখে (ফেরেশতাদের সম্বোধন করে) বলেন, হে আমার ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম।’ (সুনানুল কুবরা, বায়হাকী হাদিস: ৩৩২৪)
৩. ওয়াইল ইবনে হুজর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দরবারে হাজির হলাম। তখন তিনি আমাকে (অনেক কথার সাথে একথাও) বলেছিলেন,
يا وائل بن حجر إذا صليت فاجعل يديك حذاء أذنيك والمرأة تجعل يديها حذاء ثدييها
‘হে ওয়াইল ইবনে হুজর! যখন তুমি নামাজ শুরু করবে তখন কান বরাবর হাত উঠাবে। আর মেয়েরা হাত উঠাবে বুক বরাবর। (আলমুজামুল কাবীর, তাবারানী, হাদিস: ২৮)
উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায়, কিছু কিছু হুকুমের ক্ষেত্রে নারীদের নামাজ আদায়ের পদ্ধতি পুরুষের নামাজ আদায়ের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। বিশেষত ২নং হাদীসটি এ-কথারও ইঙ্গিত করে—নারীদেরকে এমন পদ্ধতিতেই নামাজ পড়তে বলা হচ্ছে যা তার সতর ও পর্দার জন্যে সর্বাাধিক উপযোগী।
নারীদের নামাজের ভিন্ন পদ্ধতির বিষয়টি এমনই অকাট্য ও স্পষ্ট যে এর বিপরীতে কোনো একটি হাদীসও এমন পাওয়া যাবে না যাতে বলা হয়েছে, পুরুষ ও মহিলার নামাজের পদ্ধতিতে কোনো পার্থক্য নেই; বরং উভয়ের নামাজই এক ও অভিন্ন। সাহাবায়ে কেরামের সুবিশাল জামাতের একজনকেও এমন পাওয়া যাবে না, যিনি এই পার্থক্যকে অস্বীকার করেছেন। আমরা এখানে সাহাবায়ে কেরামের কয়েকটি ফতোয়াও উল্লেখ করছি —
সাহাবায়ে কেরামের কয়েকটি ফতোয়া:
১. হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
إذا سجدت المرأة فلتحتفز ولتلصق فخذيها ببطنها
মহিলা যখন সেজদা করবে তখন সে যেন খুব জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে সেজদা করে এবং উভয় উরু পেটের সাথে মিলিয়ে রাখে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৫০৭২, মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ২/৩০৮, সুনানে কুবরা, বায়হাকী ২/২২২)
২. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মহিলা কীভাবে নামায আদায় করবে? তিনি বলেছেন,
تَجْتَمِعُ وَتَحْتَفِزُ
‘খুব জড়সড় হয়ে এক অঙ্গের সাথে আরেক অঙ্গ মিলিয়ে নামায় আদায় করবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ২৭৯৪)
রাসূল ﷺ থেকে সাহাবায়েকেরাম যে দীন শিখেছেন, তাঁদের কাছ থেকে তা শিখেছেন তাবেয়ীগণ। তাঁদের ফতোয়া থেকেও এ কথাই প্রতীয়মান হয়—নারীদের নামাজ পুরুষের নামাজ থেকে ভিন্ন। ইমাম বুখারী রহ. এর শায়েখ ইমাম ইবনে আবী শায়বা রহ. তাঁর প্রসিদ্ধ হাদীস সংকলন ‘আলমুসান্নাফ’-এ তাবেয়ী হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ, ইবনে জুরাইজ, ইবরাহীম নাখায়ী, মুজাহিদ, যুহরী, হাসান বসরী, কাতাদা রাহিমাহুমুল্লাহু তায়ালা প্রমুখের ফতোয়া উল্লেখ করেছেন। তাঁরা সকলেই নারীদের জন্যে পুরুষের চেয়ে ভিন্ন নামাজ আদায়ের পদ্ধতির ফতোয়া দিয়েছেন। (বিস্তারিত দেখুন–মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১/২৭০,৩০২,৩০৩)
চার. সাহাবী ও তাবেয়ীযুগের সোনালী যুগের পর আসে মুজতাহিদ ইমামগণের যুগ। শত শত বছর ধরে বিশ্বব্যাপী প্রায় সকল মুসলমান মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে চারটি ফিকহী মাযহাবের অনুসরণ করে আসছে—হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী। এ চার মাযহাবের মধ্যে হানাফী মাযহাব সবচেয়ে পুরনো এবং এর অনুসারীর সংখ্যাও সর্বাধিক। এ মাযহাবের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ইমামে আজম আবু হানীফা রহ. তাবেয়ী হওয়ারও সৌভাগ্য অর্জন করেন। অন্য মাযহাবের কোনো ইমাম অবশ্য তাবেয়ী ছিলেন না। এ চার মাযহাবেরই এক স্বতঃসিদ্ধ মাসআলা—নারীদের নামাজ আদায়ের পদ্ধতি পুরুষের মতো নয়। (বিস্তারিত দেখুন–হানাফী ফিকহ: কিতাবুল আসার ১/৬০৯, জামিউল মাসানীদ ১/৪০০, সিআয়া ২/১৫৬,হিদায়া ১/১০০,১১০,১১১,বাদায়িউস সানায়ে ১/৪৬৬,আল মাবসূত ১/২৫ ফাতাওয়ায়ে শামী ১/৫০৪ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১/৭৩,৭৫; মালেকী ফিকহ:আয যাখীরা ২/১৯৩; শাফেয়ী ফিকহ:কিতাবুল উম্ম-১/১৩৮; হাম্বলী ফিকহ: আল মুগনী-২/১৩৯ )।
আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।