সাহু সিজদা সংবিধিবদ্ধ করার পিছনে রহস্য হল এই যে, এটা নামাযের মধ্যে যে ত্রুটি হয় তার পূর্ণতা দান করে।
তিনটি কারণে নামাযে সাহু সিজদা দিতে হয়:
- বৃদ্ধি হওয়া। যেমন, কোন রুকূ বা সিজদা বা বসা ইত্যাদি বৃদ্ধি হওয়া।
- হ্রাস হওয়া। কোন রুকন বা ওয়াজিব কম হওয়া।
- সন্দেহ হওয়া। কত রাকাত পড়েছে তিন না চার এব্যাপারে সংশয় হওয়া।
প্রথমত: সালাতে বৃদ্ধি হওয়া:
মুছল্লী যদি নামাযের অন্তর্ভুক্ত এমন কিছু কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে বৃদ্ধি করে যেমন- দাঁড়ানো, বসা, রুকূ‘, সিজদা ইত্যাদি | যেমন দু‘বার করে রুকূ করা, তিন বার সিজদা করা, অথবা যোহর পাঁচ রাকাত আদায় করা। তবে তার সালাত বাতিল বা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের বিপরীত আমল করেছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি এমন আমল করবে, যার পক্ষে আমাদের নির্দেশনা নেই, তবে উহা প্রত্যাখ্যাত।”
কিন্তু যদি ভুলবশত তা করে এবং ঐভাবেই সালাত শেষ করে দেয়ার পর স্মরণ হয় যে, সালাতে বৃদ্ধি হয়ে গেছে, তবে শুধুমাত্র সাহু সিজদা করবে। তার সালাতও বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু সালাতরত অবস্থায় যদি উক্ত বৃদ্ধি স্মরণ হয়- যেমন চার রাকাআত শেষ করে পাঁচ রাকাআতের জন্য দাঁড়িয়ে গেছে- তবে সে ফিরে আসবে এবং শেষে সিজদায়ে সাহু করবে।
উদাহরণ: জনৈক ব্যক্তি যোহরের সালাত পাঁচ রাকাআত আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু শেষ তাশাহুদে বসার সময় এবৃদ্ধির কথা তার স্মরণ হল, তাহলে সে তাশাহুদ পূর্ণ করবে এবং সালাম ফেরাবে। তারপর সাহু সিজদা করবে এবং সালাম ফিরাবে। আর যদি সালাম ফেরানোর পর তা স্মরণ হয়, তবে সাহু সিজদা করবে এবং সালাম ফিরাবে।
আর যদি পঞ্চম রাকাআত চলা অবস্থায় স্মরণ হয় তবে তখনই বসে পড়বে এবং তাশাহুদ পড়ে সালাম ফেরাবে। তারপর সিজদায়ে সাহু করে আবার সালাম ফেরাবে।
দলীল:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ صَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الظُّهْرَ خَمْسًا فَقَالُوا أَزِيدَ فِي الصَّلَاةِ؟ قَالَ: وَمَا ذَاكَ؟ قَالُوا: صَلَّيْتَ خَمْسًا، فسجد سجدتين بعد ما سلم. وفي رواية: فَثَنَى رِجْلَيْهِ وَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ ثم سلم
আবদুল্লাহ্ বিন মাসঊদ (রা:) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যোহরের নামায পাঁচ রাক্আত পড়লেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হল, নামায কি বৃদ্ধি করা হয়েছে? তিনি বললেন, কিভাবে? তাঁরা বললেন, আপনি আজ পাঁচ রাকাআত পড়েছেন। তখন তিনি দু‘টি সিজদা করলেন। অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে, তখন তিনি পা গুটিয়ে ক্বিবলামুখি হলেন, দু‘টি সিজদা করলেন অত:পর সালাম ফেরালেন।
সালাত পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম ফেরানো:
নামায পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম ফেরানো সালাতে বৃদ্ধি করার অন্তর্গত। কেননা সালাতরত অবস্থায় সে সালামকে বৃদ্ধি করেছে। একাজ যদি ইচ্ছাকৃত করে তবে সালাত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি ভুলক্রমে হয়, কিন্তু অনেক পরে তার এ ভুলের কথা মনে পড়ল তবে নামায পুনরায় ফিরিয়ে পড়বে। আর যদি একটু পরেই (যেমন দু/এক মিনিট) তবে সে অবশিষ্ট সালাত পূর্ণ করবে এবং সালাম ফিরাবে। অতঃপর সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।
দ্বিতীয়ত: সালাতে হ্রাস হওয়া:
ক) রুকন হ্রাস হওয়া:
মুছল্লী যদি কোন রুকন কম করে ফেলে- উক্ত রুকন যদি তাকবীরে তাহরিমা (নামায শুরু করার তাকবীর) হয়, তবে তার সালাতই হবে না। চাই উহা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিক বা ভুলক্রমে ছেড়ে দিক। কেননা তার সালাতই তো শুরু হয়নি।
আর উক্ত রুকন যদি তাকবীরে তাহরিমা ব্যতীত অন্য কিছু হয় আর তা ইচ্ছাকৃত হয় তবে তার সালাত বাতিল বা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
কিন্তু যদি অনিচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে কোন রুকন ছুটে যায়- যেমন প্রথম রাকাআতে কোন রুকন ছুটে গেল, এখন যদি দ্বিতীয় রাকাআতে সেই ছুটে যাওয়া রুকনের নিকট পৌঁছে যায়- তবে এঅবস্থায় আগের রাকাআত বাতিল হয়ে যাবে এবং এটাকে প্রথম রাকাআত গণ্য করবে এবং বাকী অংশ পূরা করে সাহু সিজদা দিবে।
কিন্তু যদি দ্বিতীয় রাকাআতে ছুটে যাওয়া সেই রুকনে না পৌঁছে, তবে ছুটে যাওয়া রুকনটি আগে আদায় করবে তারপর বাকী অংশগুলো আদায় করবে এবং সাহু সিজদা দিবে।
উদাহরণ: জনৈক মুছল্লী প্রথম রাকাআতের দ্বিতীয় সিজদাটি ভুলে গেল। যখন সেকথা স্মরণ হল, তখন সে দ্বিতীয় রাকাআতের দু‘সিজদার মধ্যবর্তি স্থানে বসেছে। এঅবস্থায় আগের রাকাতটি বাতিল হয়ে যাবে এবং এটাকে প্রথম রাকাত গণ্য করে অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করে সালাত শেষে সাহু সিজদা করবে।
আর একটি উদাহরণ: জনৈক ব্যক্তি প্রথম রাকাআতে একটি মাত্র সিজদা করেছে। তারপর দ্বিতীয় সিজদা না করেই দাঁড়িয়ে পড়েছে। অতঃপর দ্বিতীয় রাকাতে রুকূ করার পর সেই ভুলের কথা স্মরণ হয়েছে, তবে সে বসে পড়বে এবং সেই ছুটে যাওয়া সিজদা দিবে এবং সেখান থেকে সালাতের বাকী অংশ পূর্ণ করে সালাম ফিরাবে। তারপর সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।
খ) কোন ওয়াজিব হ্রাস হওয়া:
মুছল্লী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ওয়াজিব পরিত্যাগ করে তবে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি ভুলক্রমে হয় আর উক্ত স্থান ছেড়ে যাওয়ার আগেই যদি স্মরণ হয়ে যায় তবে তা আদায় করবে এতে কোন দোষ নেই- সাহু সিজদা দিতে হবে না। কিন্তু যদি উক্ত ওয়াজিব ছেড়ে পরবর্তী রুকন শুরু করার আগেই স্মরণ হয়ে যায় তবে ফিরে গিয়ে সেই ওয়াজিব আদায় করবে এবং শেষে সাহু সিজদা করবে। কিন্তু পরবর্তী রুকন শুরু করার পর যদি স্মরণ হয় তবে উক্ত ছুটে যাওয়া ওয়াজিব রহিত হয়ে যাবে। অবশিষ্ট সালাত আদায় করে সালামের পূর্বে সাহু সিজদা করলেই সালাত পূর্ণ হয়ে যাবে।
উদাহরণ: একজন মুছল্লী দ্বিতীয় রাকাতের দ্বিতীয় সিজদা থেকে উঠে না বসে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াতে যাচ্ছে। এমন সময় স্মরণ হল নিজ ভুলের কথা। তখন সে বসে পড়বে এবং তাশাহুদ পড়ে সালাত পূর্ণ করবে। কোন সাহু সিজদা লাগবে না।
আর যদি কিছুটা দাঁড়ায় কিন্তু পরিপূর্ণরূপে দাঁড়ায়নি তবে সে বসে যাবে এবং তাশাহুদ পড়বে ও সালাত শেষে সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে। কিন্তু যদি পূর্ণরূপে দাঁড়িয়ে পড়ে তবে আর বসবে না। তাশাহুদ রহিত হযে যাবে। ঐভাবেই সালাত পূর্ণ করবে এবং সলাম ফিরানোর পূর্বে সাহু সিজদা করবে।
তৃতীয়ত: সন্দেহ হওয়া: সালাতের মধ্যে সন্দেহের দু‘টি অবস্থা: প্রথম অবস্থা: সন্দেহযুক্ত দু‘টি বিষয়ের মধ্যে যেটির প্রাধান্য পাবে সে অনুযায়ী কাজ করবে এবং সালাত পূর্ণ করে সালাম ফিরাবে। তারপর সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।
উদাহরণ: একজন লোক যোহরের সালাত আদায় করছে। কিন্তু সন্দেহ হল এখন সে কি দ্বিতীয় রাকাতে না তৃতীয় রাকাতে? এ সময় সে অনুমান করে স্থির করবে কোনটা ঠিক। যদি অনুমান প্রাধান্য পায় যে এটা তৃতীয় রাকাত, তবে তা তৃতীয় রাকাত গণ্য করে সালাত পূর্ণ করবে এবং সালাম ফেরানোর পর সাহু সিজদা করবে।
দলীল: আবদুল্লাহ্ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
وَإِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَتَحَرَّ الصَّوَابَ فَلْيُتِمَّ عَلَيْهِ ثُمَّ لِيُسَلِّمْ ثُمَّ يَسْجُدُ سَجْدَتَيْنِ
“তোমাদের কারো সালাতে যদি সন্দেহ হয় তবে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করবে এবং সে ভিত্তিতে সালাত পূর্ণ করবে। তারপর সালাম ফিরিয়ে দু‘টি সাহু সিজদা করবে।”
দ্বিতীয় অবস্থা: সন্দেহযুক্ত দু‘টি দিকের কোনটাই প্রাধান্য পায় না। এ অবস্থায় নিশ্চিত দিকটির উপর ভিত্তি করবে। অর্থাৎ কম সংখ্যাটি নির্ধারণ করে বাকী নামায পূর্ণ করবে। তারপর সালামের আগে সাহু সিজদা করে শেষে সালাম ফিরাবে।
উদাহরণঃ জনৈক ব্যক্তি আছরের সালাতে সন্দেহ করল- তিন রাকাত পড়েছে না দু‘রাকাত। কিন্তু অনুমান করে কোনটাই তার নিকট প্রাধান্য পেল না। এমতাবস্থায় সে তা দ্বিতীয় রাকাত ধরে প্রথম তাশাহুদ পাঠ করবে। তারপর বাকী দু‘রাকাত নামায পূর্ণ করবে এবং শেষে সালাম ফিরানোর পূর্বে সাহু সিজদা করবে। দলীল: আবু সাঈদ খুদরী (রা;) থেকে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلاتِهِ فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى ثَلاثًا أَمْ أَرْبَعًا فَلْيَطْرَحِ الشَّكَّ وَلْيَبْنِ عَلَى مَا اسْتَيْقَنَ ثُمَّ يَسْجُدُ سَجْدَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يُسَلِّمَ فَإِنْ كَانَ صَلَّى خَمْسًا شَفَعْنَ لَهُ صَلَاتَهُ وَإِنْ كَانَ صَلَّى إِتْمَامًا لِأَرْبَعٍ كَانَتَا تَرْغِيمًا لِلشَّيْطَانِ
“তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি সালাতে সন্দেহ করে যে, তিন রাকাত পড়েছে না চার রাকাত? তবে সে সন্দেহকে বর্জন করবে এবং নিশ্চিতের উপর ভিত্তি করবে। তারপর সালাম ফেরানোর পূর্বে দু‘টি সিজদা করবে। যদি পাঁচ রাকাত পড়ে থাকে তবে সালাত বেজোড় থেকে জোড় হয়ে যাবে। আর যদি চার রাকাতই পড়ে থাকে, তবে এসিজদা দু‘টি শয়তানকে অপমানের জন্য হবে।”
সারকথা: পূর্বেল্লেখিত আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, সিজদায়ে সাহু কখনো সালামের আগে কখনো সালামের পর করতে হয়।
সালামের পূর্বে সাহু সিজদা দু‘ক্ষেত্রে করতে হয়:
- সালাতে যদি কোন ওয়াজিব হ্রাস হয়।
- সালাতে যদি সন্দেহ হয় এবং দু‘টি দিকের কোনটিই প্রাধান্য না পায়, তবে সালামের পূর্বে সাহু সিজদা করবে।
সালামের পর দু‘ক্ষেত্রে সাহু সিজদা করতে হয়:
- যদি সালাতে বৃদ্ধি হয়ে যায়।
- যদি সন্দেহ হয় এবং যে কোন একটি দিক অনুমানের ভিত্তিতে প্রাধান্য লাভ করে, তবে সালামের পর সাহু সিজদা করবে।